[1] যখন স্থির হল যে আমরা জাহাজে করে ইতালি যাত্রা করব, পৌল ও আরও কিছু বন্দিকে সম্রাট অগাস্টাসের সৈন্যদলের একজন শতসেনাপতি, জুলিয়াসের হাতে অর্পণ করা হল।
[2] আমরা আদ্রামুত্তিয়ামের একটি জাহাজে আরোহণ করলাম, যেটি এশিয়া প্রদেশের উপকূলবর্তী বিভিন্ন বন্দরে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আমরা সমুদ্রযাত্রা শুরু করলাম। থিষলনিকা থেকে আগত আরিষ্টার্খ নামে একজন ম্যাসিডোনিয়াবাসী আমাদের সঙ্গে ছিল।
[3] পরের দিন, আমরা সীদোনে অবতরণ করলাম। জুলিয়াস পৌলের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বন্ধুদের কাছে তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন, যেন তারা তাঁর সব প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাতে পারে।
[4] সেখান থেকে আমরা আবার সমুদ্রযাত্রা শুরু করলাম এবং বাতাস যেহেতু আমাদের প্রতিকূলে বইছিল, আমরা সাইপ্রাস দ্বীপের আড়ালে আড়ালে যেতে লাগলাম।
[5] যখন আমরা কিলিকিয়া ও পাম্ফুলিয়া উপকূলের সম্মুখবর্তী সমুদ্র অতিক্রম করলাম, আমরা লুসিয়া-প্রদেশের ম্যুরায় অবতরণ করলাম।
[6] সেখানে শতসেনাপতি একটি আলেকজান্দ্রীয় জাহাজকে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করতে দেখে আমাদের সেই জাহাজে তুলে দিলেন।
[7] বহুদিন যাবৎ মন্থর গতিতে চলার পর আমরা কষ্টের সঙ্গে ক্নীদের কাছে এসে পৌঁছালাম। বাতাস যখন আমাদের নির্ধারিত পথে যাত্রা করতে দিল না, আমরা সলমোনির বিপরীত দিকে ক্রীট দ্বীপের আড়ালে আড়ালে পাড়ি দিলাম।
[8] কষ্ট করে আমরা উপকূল বরাবর যেতে যেতে, লাসেয়া নগরের নিকটবর্তী সুন্দর পোতাশ্রয় নামে একটি স্থানে এসে পৌঁছালাম।
[9] এভাবে অনেক সময় নষ্ট হয়েছিল। উপবাস-পর্ব শেষ হওয়ার পরে এই সময়ে সমুদ্রযাত্রা ইতিমধ্যে বিপদসংকুল হয়ে পড়েছিল। তাই পৌল তাদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন,
[10] “মহাশয়েরা, আমি দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সমুদ্রযাত্রা দুর্দশাজনক হবে, জাহাজ ও মালপত্রের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি হবে, আবার আমাদেরও প্রাণসংশয় হতে পারে।”
[11] কিন্তু শতসেনাপতি, পৌলের কথায় কর্ণপাত না করে, নাবিকের ও জাহাজের মালিকের পরামর্শ মেনে চললেন।
[12] যেহেতু পোতাশ্রয়টি আগত শীতকাল যাপনের পক্ষে অনুপযুক্ত হওয়ায়, অধিকাংশ জনই সমুদ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তারা আশা করছিল যে ফিনিক্সে পৌঁছে সেখানে শীতকাল যাপন করবে। এটি ছিল ক্রীটের একটি বন্দর, যার সম্মুখভাগ ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম, উভয় দিকেরই অভিমুখী।
[13] যখন এক মৃদুমন্দ দখিণা-বাতাস বইতে লাগল, তারা ভাবল, তারা যা চেয়েছিল, তাই হয়েছে। ফলে তারা নোঙর তুলে ক্রীটের উপকূল বরাবর যাত্রা করল।
[14] অতি অল্প সময়ের মধ্যেই উরাকুলো নামে প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন এক ঘূর্ণিঝড় দ্বীপের দিক থেকে আছড়ে পড়ল।
[15] জাহাজটি ঝড়ের মুখে পড়ল এবং বাতাসের মধ্য দিয়ে যেতে পারল না। তাই আমরা তা ভেসে যেতে দিলাম।
[16] যখন আমরা কৌদা নামবিশিষ্ট ছোট্ট একটি দ্বীপের আড়াল দিয়ে যাচ্ছিলাম, আমরা অতিকষ্টে জাহাজের জীবন-রক্ষাকারী নৌকাটি নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারলাম।
[17] লোকেরা যখন সেটিকে পাটাতনের উপরে তুলল, তারা নিচে থেকে দড়ি দিয়ে সেটিকে জাহাজের সঙ্গে একত্র বাঁধল। সূর্তির বালির চড়ায় আটকে পড়ার ভয়ে তারা সমুদ্রে নোঙর নামিয়ে দিল এবং জাহাজটিকে ভেসে যেতে দিল।
[18] আমরা ঝড়ের এমন প্রচণ্ড দাপটের মুখে পড়লাম যে, পরের দিন তারা জাহাজের মালপত্র ফেলে দিতে লাগল।
[19] তৃতীয় দিনে তারা নিজের হাতে জাহাজের সাজসরঞ্জাম জলে ফেলে দিল।
[20] যখন বহুদিন পর্যন্ত সূর্য বা নক্ষত্ররাশি দেখা গেল না এবং ঝড়ের তাণ্ডব অব্যাহত রইল, আমরা শেষে রক্ষা পাওয়ার সব আশা ছেড়ে দিলাম।
[21] লোকেরা দীর্ঘকাল অনাহারে থাকার পর, পৌল তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “মহাশয়েরা, আমার পরামর্শ গ্রহণ করে ক্রীট থেকে আপনাদের যাত্রা না করাই উচিত ছিল; তাহলে আপনাদের এই ক্ষয়ক্ষতি হত না।
[22] কিন্তু এখন আমি আপনাদের অনুনয় করছি, আপনারা সাহস রাখুন, কারণ আপনাদের কারও প্রাণহানি হবে না, কেবলমাত্র জাহাজটি ধ্বংস হবে।
[23] আমি যে ঈশ্বরের আপনজন ও আমি যার আরাধনা করি, তাঁর এক দূত গত রাত্রে আমার পাশে দাঁড়িয়ে
[24] বললেন, ‘পৌল, তুমি ভয় পেয়ো না। তোমাকে কৈসরের সামনে বিচারের জন্য উপস্থিত হতেই হবে। আর ঈশ্বর দয়াপরবশ হয়ে যাঁরা তোমার সঙ্গে সমুদ্রযাত্রা করছে, তাদের সকলের জীবন তোমায় দান করেছেন।’
[25] সেই কারণে মহাশয়েরা, আপনাদের সাহস রাখুন, কারণ ঈশ্বরের উপরে আমার বিশ্বাস আছে যে, তিনি আমার কাছে যেমন ব্যক্ত করেছেন, তেমনই ঘটবে।
[26] তবুও, আমাদের কোনো দ্বীপে গিয়ে উঠতেই হবে।”
[27] চৌদ্দতম রাত্রিতে, আমরা তখনও আদ্রিয়া-সমুদ্রের উপর দিয়ে ভেসে চলেছি, এমন সময়ে, প্রায় মধ্যরাত্রিতে, নাবিকরা অনুমান করল, তারা কোনও ভূখণ্ডের কাছাকাছি এসে পড়েছে।
[28] তারা মেপে দেখল যে, জলের গভীরতা একশো কুড়ি ফুট। অল্প কিছুক্ষণ পরে তারা আবার মেপে দেখল, জলের গভীরতা নব্বই ফুট।
[29] কোনো পাথরের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ হওয়ার আশঙ্কায়, তারা জাহাজের পিছন দিক থেকে চারটি নোঙর ফেলে দিয়ে দিনের আলোর জন্য প্রার্থনা করতে লাগল।
[30] আর জাহাজ থেকে পালানোর অভিপ্রায়ে, নাবিকেরা জাহাজের সামনের দিক থেকে কয়েকটি নোঙর নামিয়ে দেওয়ার ছলে, সমুদ্রে প্রাণরক্ষাকারী নৌকাটিকে নামিয়ে দিল।
[31] পৌল তখন শতসেনাপতি ও সৈন্যদের বললেন, “এই লোকগুলি জাহাজে না থাকলে, আপনারা রক্ষা পাবেন না।”
[32] তখন সৈন্যরা নৌকার দড়িগুলি কেটে দিয়ে সেটিকে জলে পড়ে যেতে দিল।
[33] ভোরের ঠিক আগে, পৌল তাদের সবাইকে কিছু আহার করার জন্য অনুনয় করলেন। তিনি বললেন, “গত চোদ্দো দিন যাবৎ আপনারা ক্রমাগত উদ্বেগের মধ্যে আছেন এবং অনাহারে কাটিয়েছেন, আপনারা কিছুই আহার করেননি।
[34] এখন কিছু খাওয়ার জন্য আমি আপনাদের অনুরোধ করছি। আপনাদের বেঁচে থাকার জন্য এর প্রয়োজন আছে। আপনাদের একজনেরও মাথার একটি চুলও নষ্ট হবে না।”
[35] একথা বলার পর, তিনি কিছু রুটি নিয়ে তাদের সকলের সামনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর তা ভেঙে তিনি খেতে লাগলেন।
[36] এতে তারা সকলেই উত্সাহিত হয়ে কিছু কিছু খাদ্যগ্রহণ করল।
[37] জাহাজে আমরা সর্বসুদ্ধ দুই শত ছিয়াত্তর জন ছিলাম।
[38] তারা যখন নিজেদের ইচ্ছেমতো পর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণ করল, তারা খাদ্যশস্য সমুদ্রে ফেলে দিয়ে জাহাজের ভার লাঘব করল।
[39] দিনের আলো ফুটে উঠলে তারা ভূখণ্ডটি চিনতে পারল না। কিন্তু তারা একটি উপসাগর দেখতে পেল, যার তীরভূমি বালুকাময় ছিল। তারা স্থির করল, সম্ভব হলে তারা জাহাজটিকে চড়ায় আটকে দেবে।
[40] নোঙরগুলি কেটে দিয়ে তারা সেগুলি সমুদ্রে ফেলে দিল। সেই সঙ্গে হালের সঙ্গে বাঁধা দড়িগুলিও তারা খুলে দিল। এরপর তারা বাতাসের অনুকূলে পাল তুলে দিয়ে তীরের অভিমুখে এগিয়ে চলল।
[41] কিন্তু জাহাজ একটি বালির চড়ায় ধাক্কা মারল এবং আটকে গেল। জাহাজের সামনের দিকটি জোরে ধাক্কা মারল ও তা অচল হয়ে রইল। কিন্তু পিছনের দিকটি ঢেউয়ের প্রবল আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
[42] বন্দিরা কেউ যেন সাঁতার কেটে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য সৈন্যরা তাদের হত্যা করার পরামর্শ করল।
[43] কিন্তু শতসেনাপতি পৌলের প্রাণরক্ষা করার ইচ্ছায় তাদের সেই পরিকল্পনা কার্যকর হতে দিলেন না। তিনি আদেশ দিলেন, যারা সাঁতার জানে, প্রথমে তারাই যেন জলে ঝাঁপ দিয়ে তীরে ওঠে।
[44] অবশিষ্ট সকলে যেন তক্তা বা জাহাজের ভাঙা অংশ নিয়ে সেখানে পৌঁছায়। এভাবে প্রত্যেকেই নিরাপদে তীরে পৌঁছে গেল।