[1] এরপর যীশু ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার ঘোষণা করতে করতে বিভিন্ন গ্রাম ও নগর পরিক্রমা করতে লাগলেন। সেই বারোজন প্রেরিত-শিষ্যও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
[2] মন্দ-আত্মা ও বিভিন্ন রোগ থেকে সুস্থতা লাভ করেছিলেন, এমন আরও কয়েকজন মহিলা তাঁদের সহযাত্রী হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন (মাগ্দালাবাসী নামে আখ্যাত) সেই মরিয়ম, যাঁর মধ্যে থেকে যীশু সাতটি ভূত তাড়িয়ে ছিলেন,
[3] হেরোদের গৃহস্থালীর প্রধান ব্যবস্থাপক কূষের স্ত্রী যোহান্না, শোশন্না এবং আরও অনেকে। এই মহিলারা আপন আপন সম্পত্তি থেকে তাঁদের পরিচর্যা করতেন।
[4] যখন অনেক লোক সমবেত হচ্ছিল এবং বিভিন্ন নগর থেকে লোকেরা যীশুর কাছে আসছিল, তিনি তাদের এই রূপক কাহিনিটি বললেন:
[5] “একজন কৃষক বীজবপন করতে গিয়েছিল। সে বীজ ছড়াবার সময় কতগুলি বীজ রাস্তার উপরে পড়ল; সেগুলি পদদলিত হল, আর আকাশের পাখিরা সেগুলি খেয়ে নিল।
[6] কতগুলি বীজ পড়ল পাথরের উপর। সেগুলির অঙ্কুরোদ্গম হল, কিন্তু রস না থাকায় চারাগুলি শুকিয়ে গেল।
[7] কিছু বীজ পড়ল কাঁটাঝোপের মধ্যে। কাঁটাঝোপ চারাগাছের সঙ্গেই বেড়ে উঠে তাদের ঢেকে ফেলল।
[8] আবার কিছু বীজ পড়ল উৎকৃষ্ট জমিতেও, সেখানে গাছগুলি বেড়ে উঠে যা বপন করা হয়েছিল, তার শতগুণ ফসল উৎপন্ন করল।” একথা বলার পর তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন, “যার শোনবার কান আছে, সে শুনুক।”
[9] তাঁর শিষ্যেরা তাঁকে এই রূপকের অর্থ জিজ্ঞাসা করলেন।
[10] তিনি বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্যের নিগুঢ়তত্ত্বগুলি তোমাদেরই কাছে ব্যক্ত হয়েছে, কিন্তু অন্যদের কাছে আমি রূপকের আশ্রয়ে কথা বলি যেন, “ ‘দেখেও তারা দেখতে না পায়, আর শুনেও তারা না পারে বুঝতে।’
[11] “এই রূপকের অর্থ হল এরকম: সেই বীজ ঈশ্বরের বাক্য।
[12] পথের উপর পতিত বীজ হল কিছু লোক, যারা বাক্য শোনে, আর পরে দিয়াবল এসে তাদের অন্তর থেকে বাক্য হরণ করে, যেন তারা বিশ্বাস করতে না পারে ও পরিত্রাণ না পায়।
[13] পাথুরে জমির উপরে পতিত বীজ হল তারাই, যারা ঈশ্বরের বাক্য শোনামাত্র সানন্দে গ্রহণ করে, কিন্তু মূল না থাকায় তাদের বিশ্বাস হয় ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরীক্ষার সময় তারা বিপথগামী হয়।
[14] কাঁটাঝোপের মধ্যে পতিত বীজ তারা, যারা বাক্য শোনে, কিন্তু জীবনে চলার পথে বিভিন্ন দুশ্চিন্তা, ধনসম্পত্তি ও বিলাসিতায় ব্যাহত হয়ে পরিপক্ব হতে পারে না।
[15] কিন্তু উৎকৃষ্ট জমিতে পতিত বীজের সদৃশ তারাই, যারা উদার ও শুদ্ধচিত্ত, তারা বাক্য শুনে তা আঁকড়ে থাকে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে প্রচুর শস্য উৎপন্ন করে।
[16] “প্রদীপ জ্বেলে কেউ পাত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখে না, বা খাটিয়ার নিচেও রেখে দেয় না। বরং প্রদীপটিকে সে একটি দীপাধারের উপরে রেখে দেয়, যেন যারা ভেতরে প্রবেশ করে, তারা আলো দেখতে পায়।
[17] কারণ গুপ্ত এমন কিছুই নেই, যা জানা যাবে না, বা প্রকাশ্যে উদ্ঘাটিত হবে না।
[18] কাজেই কীভাবে শুনছ, সে বিষয়ে সতর্ক থেকো। যার আছে তাকে আরও দেওয়া হবে; যার নেই, এমনকি, কিছু আছে বলে যদি সে মনে করে, তাও তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে।”
[19] এরপর যীশুর মা ও ভাইয়েরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন, কিন্তু ভিড়ের জন্য তাঁরা তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারলেন না।
[20] একজন তাঁকে বলল, “আপনার মা ও ভাইয়েরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।”
[21] তিনি উত্তর দিলেন, “যারা ঈশ্বরের বাক্য শুনে সেইমতো কাজ করে, তারাই আমার মা ও সব ভাই।”
[22] একদিন যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, “চলো আমরা হ্রদের ওপারে যাই।” এতে তাঁরা একটি নৌকায় আরোহণ করে যাত্রা করলেন।
[23] তাঁরা নৌকা চালানো শুরু করলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এমন সময় হ্রদের উপর প্রচণ্ড ঝড় উঠল, নৌকা জলে পূর্ণ হতে লাগল। তাঁরা এক ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন হলেন।
[24] শিষ্যেরা কাছে গিয়ে তাঁকে জাগালেন, “প্রভু, প্রভু, আমরা যে ডুবতে বসেছি!” তিনি উঠে বাতাস ও উত্তাল জলরাশিকে ধমক দিলেন, ঝড় শান্ত হয়ে গেল। সবকিছু শান্ত হল।
[25] তিনি তাঁর শিষ্যদের বললেন, “তোমাদের বিশ্বাস কোথায় গেল?” ভয়ে-বিস্ময়ে তাঁরা পরস্পর বলাবলি করলেন, “ইনি তাহলে কে, যিনি বাতাস ও জলকে আদেশ দিলে, তারাও এঁর কথা মেনে চলে?”
[26] তাঁরা গেরাসেনী অঞ্চলের দিকে নৌকা ছেড়ে দিলেন। স্থানটি গালীল হ্রদের অপর পারে অবস্থিত।
[27] যীশু তীরে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই নগরের এক ভূতগ্রস্ত ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেলেন। বহুদিন ধরে এই লোকটি বিনা কাপড়ে উলঙ্গ হয়ে থাকত, বাড়িতে বসবাস করত না। সে থাকত কবরস্থানে।
[28] সে যীশুকে দেখে চিৎকার করে উঠল এবং তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে উচ্চৈঃস্বরে বলল, “পরাৎপর ঈশ্বরের পুত্র যীশু, আপনি আমাকে নিয়ে কী করতে চান?”
[29] আমি আপনার কাছে মিনতি করি, আমাকে যন্ত্রণা দেবেন না। কারণ লোকটির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যীশু সেই অশুচি আত্মাকে আদেশ দিয়েছিলেন। বারবার সে তার উপর ভর করত। লোকটির হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে সতর্ক পাহারা রাখা হলেও, সে তার শিকল ছিঁড়ে ফেলত, আর ভূত তাকে তাড়িয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যেত।
[30] যীশু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী?” “বাহিনী,” সে উত্তর দিল, কারণ বহু ভূত তার মধ্যে প্রবেশ করেছিল।
[31] তারা তাঁর কাছে বারবার অনুরোধ করতে লাগল, তিনি যেন তাদের রসাতলে না পাঠান।
[32] সেখানে পাহাড়ের গায়ে বিশাল একপাল শূকর চরে বেড়াচ্ছিল। ভূতেরা শূকরদের মধ্যে প্রবেশ করার অনুমতি প্রার্থনা করে যীশুকে অনুনয় করল। তিনি তাদের অনুমতি দিলেন।
[33] ভূতেরা লোকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সেই শূকরপালের মধ্যে প্রবেশ করল। শূকরের পাল পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে ছুটে এসে হ্রদে পড়ে ডুবে গেল।
[34] যারা শূকর চরাচ্ছিল, তারা এই ঘটনাটি দেখে দ্রুত পালিয়ে গেল এবং নগরে ও গ্রামাঞ্চলে গিয়ে এই খবর দিল।
[35] কী ঘটেছে দেখবার জন্য লোকেরা বাইরে এল। যীশুর কাছে উপস্থিত হয়ে তারা দেখতে পেল, সেই লোকটি ভূতের কবলমুক্ত হয়ে পোশাক পরে সুস্থ মনে যীশুর পায়ের কাছে বসে আছে। এই দেখে তারা ভয় পেয়ে গেল।
[36] ভূতগ্রস্ত লোকটি কীভাবে সুস্থ হয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা তা সকলকে বলতে লাগল।
[37] তখন গেরাসেনী অঞ্চলের লোকেরা ভয় পেয়ে তাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য যীশুকে অনুরোধ করল। যীশু তখন নৌকায় উঠে চলে গেলেন।
[38] যে লোকটির মধ্য থেকে ভূতেরা বেরিয়ে এসেছিল, সে তাঁর সঙ্গী হওয়ার জন্য যীশুকে অনুনয় করতে লাগল। কিন্তু যীশু তাকে ফিরিয়ে দিলেন,
[39] বললেন, “তুমি বাড়ি ফিরে যাও, আর লোকদের গিয়ে বলো, ঈশ্বর তোমার জন্য কী করেছেন।” তাই লোকটি চলে গেল, আর যীশু তার জন্য যা করেছেন, সেকথা নগরের সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগল।
[40] যীশু ফিরে আসার পর লোকেরা তাঁকে স্বাগত জানাল, কারণ তারা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
[41] সেই সময়, যায়ীর নামে এক ব্যক্তি এসে যীশুর পায়ে লুটিয়ে পড়লেন; তিনি ছিলেন সমাজভবনের একজন অধ্যক্ষ। তাঁর বাড়িতে আসার জন্য তিনি তাঁকে মিনতি করলেন।
[42] কারণ তার প্রায় বারো বছরের একমাত্র কন্যা তখন ছিল মৃত্যুশয্যায়। যীশু যখন পথ চলছিলেন, মানুষের ভিড়ে তাঁর চাপা পড়ার উপক্রম হল।
[43] সেখানে এক নারী ছিল, যে বারো বছর ধরে রক্তস্রাবের ব্যাধিতে ভুগছিল। সে চিকিৎসকদের পেছনে তার সর্বস্ব ব্যয় করেছিল, কিন্তু কেউ তাকে সুস্থ করতে পারেনি।
[44] সে তার পেছনে এসে তাঁর পোশাকের আঁচল স্পর্শ করল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল।
[45] যীশু জিজ্ঞাসা করলেন, “কে আমাকে স্পর্শ করল?” তারা সবাই অস্বীকার করলে পিতর বললেন, “প্রভু, লোকেরা ভিড় করে যে আপনার উপরে চেপে পড়ছে!”
[46] কিন্তু যীশু বললেন, “কেউ একজন আমাকে স্পর্শ করেছে, কারণ আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমার ভেতর থেকে শক্তি নির্গত হয়েছে।”
[47] নারীটি দেখল, সে অলক্ষিত থাকেনি। সে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে, যীশুর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। সে সমস্ত লোকের সাক্ষাতে বলল, কেন সে তাঁকে স্পর্শ করেছিল এবং কীভাবে, সেই মুহূর্তেই সে সুস্থ হয়েছে।
[48] তখন যীশু তাকে বললেন, “কন্যে, তোমার বিশ্বাসই তোমাকে সুস্থ করেছে। শান্তিতে প্রস্থান করো।”
[49] যীশু তখনও কথা বলছেন, এমন সময় সমাজভবনের অধ্যক্ষ যায়ীরের বাড়ি থেকে একজন এসে উপস্থিত হল। সে বলল, “আপনার কন্যাটি মারা গেছে। গুরুমহাশয় কে আর কষ্ট দেবেন না।”
[50] একথা শুনে যীশু যায়ীরকে বললেন, “ভয় পাবেন না, শুধু বিশ্বাস রাখুন, সে সুস্থ হয়ে যাবে।”
[51] তিনি যায়ীরের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে পিতর, যোহন ও যাকোব এবং মেয়েটির পিতামাতা ছাড়া আর কাউকে তাঁর সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেন না।
[52] সেই সময়, সমস্ত লোক মেয়েটির জন্য শোক ও বিলাপ করছিল। যীশু বললেন, “তোমাদের বিলাপ বন্ধ করো। সে মারা যায়নি, ঘুমিয়ে আছে মাত্র।”
[53] তারা জানত, মেয়েটি মারা গেছে, তাই তারা যীশুকে উপহাস করল।
[54] কিন্তু যীশু মেয়েটির হাত ধরে বললেন, “খুকুমণি, ওঠো!”
[55] তার আত্মা ফিরে এল এবং সে তখনই উঠে দাঁড়াল। তখন যীশু মেয়েটিকে কিছু খেতে দিতে তাদের বললেন।
[56] তার পিতামাতা ভীষণ অবাক হয়ে গেল। কিন্তু তিনি এই ঘটনার বিষয় কাউকে কিছু বলতে তাদের নিষেধ করে দিলেন।