[1] ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ সেখানে সমবেত হলে এমন অবস্থা হল যে, একে অন্যের পা-মাড়াতে লাগল। যীশু প্রথমে তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দিতে লাগলেন, বললেন, “ফরিশীদের খামির, অর্থাৎ ভণ্ডামি থেকে তোমরা নিজেদের সাবধানে রেখো।
[2] গোপন এমন কিছুই নেই, যা প্রকাশিত হবে না, লুকোনো এমন কিছুই নেই, যা অজানা থেকে যাবে।
[3] অন্ধকারে উচ্চারিত তোমাদের বাণী শোনা যাবে প্রকাশ্য দিবালোকে। আর ভেতরের ঘরে যে কথা তুমি চুপিচুপি বলেছ, তা ঘোষণা করা হবে ছাদের উপর থেকে।
[4] “আমার বন্ধু সব, আমি তোমাদের বলছি, শরীরকে হত্যা করার বেশি আর কিছু করার সাধ্য যাদের নেই, তাদের তোমরা ভয় কোরো না।
[5] কিন্তু কাকে ভয় করতে হবে, তা আমি তোমাদের বলছি, তোমরা তাঁকেই ভয় কোরো, শরীরকে হত্যা করার পর যাঁর ক্ষমতা আছে তোমাদের নরকে নিক্ষেপ করার। হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, তোমরা তাঁকেই ভয় কোরো।
[6] দুই পয়সায় কি পাঁচটি চড়ুইপাখি বিক্রি হয় না? তবুও তাদের একটিকেও ঈশ্বর ভোলেন না।
[7] প্রকৃতপক্ষে, তোমাদের মাথার সব চুলের সংখ্যাও গণনা করা আছে। তোমরা ভয় পেয়ো না, কারণ বহু চড়ুই পাখির চেয়ে তোমরা বেশি মূল্যবান।
[8] “আমি তোমাদের বলছি, যে আমাকে মানুষদের সাক্ষাতে স্বীকার করে, মনুষ্যপুত্রও তাকে ঈশ্বরের দূতদের সাক্ষাতে স্বীকার করবেন।
[9] কিন্তু মানুষদের সাক্ষাতে যে আমাকে অস্বীকার করে, ঈশ্বরের দূতদের সাক্ষাতে তাকেও অস্বীকার করা হবে।
[10] মনুষ্যপুত্রের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে, তাকে ক্ষমা করা হবে, কিন্তু পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে কেউ যদি নিন্দা করে, তার ক্ষমা হবে না।
[11] “যখন সমাজভবনের শাসনকর্তা ও কর্তৃপক্ষের সামনে তোমাদের টেনে আনা হয়, তখন তোমরা কীভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করবে, অথবা কী বলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না।
[12] কারণ সে সময়ে তোমাদের কী বলতে হবে, পবিত্র আত্মা তা শিখিয়ে দেবেন।”
[13] লোকদের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল, “গুরুমহাশয়, আমার ভাইকে বলুন, সে যেন পৈত্রিক সম্পত্তি আমার সঙ্গে ভাগ করে নেয়।”
[14] যীশু উত্তর দিলেন, “ওহে, কে আমাকে তোমাদের বিচার, অথবা মধ্যস্থতা করার জন্য নিযুক্ত করেছে?”
[15] তারপর তিনি তাঁদের বললেন, “সজাগ থেকো! সমস্ত রকম লোভ থেকে নিজেদের রক্ষা কোরো; সম্পদের প্রাচুর্যের উপরে মানুষের জীবনের মানদণ্ড নির্ভর করে না।”
[16] আর তিনি তাদের এই রূপকটি বললেন: “এক ধনবানের জমিতে প্রচুর ফসল হয়েছিল।
[17] সে চিন্তা করল, ‘আমি কী করব? ফসল মজুত করার মতো কোনো জায়গা আমার নেই।’
[18] “তারপর সে বলল, ‘আমি এই কাজ করব, আমার গোলাঘরগুলি ভেঙে আমি বড় বড় গোলাঘর নির্মাণ করব। সেখানে আমার সমস্ত ফসল আর অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী মজুত করব।
[19] তারপর নিজেকে বলব, “তুমি বহু বছরের জন্য অনেক ভালো ভালো জিনিস মজুত করেছ। এবার জীবনকে সহজভাবে নাও; ভোজনপান ও আমোদ স্ফূর্তি করো।” ’
[20] “কিন্তু ঈশ্বর তাকে বললেন, ‘মূর্খ! আজ রাতেই তোমার প্রাণ তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে। তাহলে, তোমার নিজের জন্য যে আয়োজন করে রেখেছ, তখন কে তা ভোগ করবে?’
[21] “যে নিজের জন্য ধন সঞ্চয় করে, অথচ ঈশ্বরের উদ্দেশে ধনী নয়, তার পরিণতি এরকমই হবে।”
[22] এরপর যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, “তাই আমি তোমাদের বলছি, কী খাবে বলে জীবনের বিষয়ে, বা কী পরবে বলে শরীরের সম্পর্কে তোমরা দুশ্চিন্তা কোরো না।
[23] খাদ্যের চেয়ে জীবন এবং পোশাকের চেয়ে শরীর অনেক বড় বিষয়।
[24] কাকদের কথা ভেবে দেখো, তারা শস্য বোনে না, বা কাটেও না, তাদের কোনও গুদাম, বা গোলাঘরও নেই, তবুও ঈশ্বর তাদের আহার দেন। পাখিদের চেয়ে তোমাদের মূল্য আরও কত না বেশি!
[25] দুশ্চিন্তা করে কে তার আয়ু আর একটি ঘণ্টাও বাড়াতে পারে?
[26] অতএব, তোমরা যখন এই সামান্য কাজটুকু করতে পারো না, তখন অন্য সব বিষয়ে তোমরা দুশ্চিন্তা করো কেন?
[27] “লিলি ফুলগুলো কেমন বেড়ে ওঠে, ভেবে দেখো। তারা পরিশ্রম কাটে না, সুতোও কাটে না। তবুও আমি তোমাদের বলছি, শলোমন তাঁর বিপুল ঐশ্বর্যের মধ্যেও এদের একটির মতো সুসজ্জিত ছিলেন না।
[28] অল্পবিশ্বাসীর দল! মাঠের যে ঘাসগুলি আজ আছে, আর কাল আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, সেগুলি ঈশ্বর যদি এমনভাবে সুশোভিত করে থাকেন, তাহলে তোমাদের আরও কত না বেশি সজ্জিত করবেন!
[29] আর কী আহার করবে বা কী পান করবে, তা নিয়ে তোমাদের হৃদয়কে ব্যাকুল কোরো না, এজন্য তোমরা দুশ্চিন্তা কোরো না।
[30] কারণ জগতে ঈশ্বরে অবিশ্বাসীরা এসব জিনিসের পেছনে ছুটে বেড়ায়; কিন্তু তোমাদের পিতা জানেন, তোমাদের এগুলির প্রয়োজন আছে।
[31] কিন্তু তোমরা প্রথমে তাঁর রাজ্যের অন্বেষণ করো, তাহলে এই সমস্ত দ্রব্যও তোমাদের দেওয়া হবে।
[32] “ক্ষুদ্র মেষপাল, তোমরা ভয় পেয়ো না, কারণ তোমাদের পিতা এই রাজ্য তোমাদের দান করেই প্রীত হয়েছেন।
[33] তোমাদের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করে দীনদরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দাও। নিজেদের জন্য এমন টাকার থলি তৈরি করো, যা কোনোদিন জীর্ণ হবে না; স্বর্গে এমন ঐশ্বর্য সংগ্রহ করো, যা কোনোদিন নিঃশেষ হবে না। সেখানে কোনো চোর কাছে আসে না, কোনো কীটপতঙ্গ তা নষ্ট করে না।
[34] কারণ যেখানে তোমাদের ধনসম্পদ থাকবে, সেখানেই থাকবে তোমাদের মন।
[35] “সেবার জন্য সজ্জিত হয়ে প্রস্তুত থাকো, তোমাদের প্রদীপ জ্বেলে রাখো।
[36] প্রভু বিবাহ বাসর থেকে ফিরে এসে দ্বারে কড়া নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বার খুলে দেওয়ার জন্য পরিচারকেরা যেমন গৃহকর্তার প্রতীক্ষায় থাকে, তেমনই তোমরাও প্রস্তুত থেকো।
[37] ফিরে এসে প্রভু যাদের সজাগ দেখবেন, সেই দাসদের কাছে তা মঙ্গলজনক হয়ে উঠবে। আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তিনি নিজে তখন পরিবেশনের জন্য তৈরি হবেন, ভোজন করতে বসিয়ে কাছে এসে তাদের পরিবেশন করবেন।
[38] রাতের দ্বিতীয়, বা তৃতীয় প্রহরে এসেও তিনি যাদের প্রস্তুত থাকতে দেখবেন, তাদের পক্ষে তা হবে মঙ্গলজনক।
[39] কিন্তু বুঝে দেখো, গৃহকর্তা যদি জানতেন, চোর কখন আসবে, তাহলে তিনি তাঁর ঘরে সিঁধ কাটতে দিতেন না।
[40] সেইরকম, তোমরাও প্রস্তুত থেকো, কারণ মনুষ্যপুত্রের আগমন সেই সময় হবে, যখন তোমরা প্রস্তুত থাকবে না।”
[41] পিতর জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, আপনি এই রূপকটি শুধুমাত্র আমাদেরই বলছেন, না সবাইকেই বলছেন?”
[42] প্রভু উত্তর দিলেন, “তাহলে সেই বিশ্বস্ত ও বিজ্ঞ গৃহাধ্যক্ষ কে, যার উপর মনিব গৃহের অন্যান্য দাসদের যথাসময়ে আহার দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করবেন?
[43] ধন্য সেই দাস, গৃহকর্তা ফিরে এসে যাকে সেই কাজে ব্যাপৃত থাকতে দেখবেন।
[44] আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তত্ত্বাবধানের ভার তারই উপরে অর্পণ করবেন।
[45] কিন্তু মনে করো, সেই দাস ভাবল, ‘আমার মনিবের ফিরে আসতে এখনও অনেক দেরি,’ সে তখন দাস-দাসীদের প্রহার করতে শুরু করল, পানাহার করতে ও মত্ত হতে লাগল।
[46] সেই দাসের মনিব এমন দিনে ফিরবেন, যেদিন সে তাঁকে প্রত্যাশাই করবে না এবং এমন সময়ে আসবেন, যে সময়ের কথা সে জানতেও পারবে না। তিনি তাকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে অবিশ্বাসীদের মধ্যে তার স্থান নিরূপণ করবেন।
[47] “যে পরিচারক তার মনিবের ইচ্ছা জেনেও প্রস্তুত হয়ে থাকে না বা প্রভুর ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করে না, তাকে কঠোর দণ্ড দেওয়া হবে।
[48] কিন্তু যে না জেনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে, সে কম দণ্ডিত হবে। যাকে অনেক দেওয়া হয়েছে, তার কাছে দাবিও করা হবে অনেক; যার উপর বহু বিষয়ের ভার অর্পিত হয়েছে, তার কাছে আরও বেশি দাবি করা হবে।
[49] “আমি পৃথিবীতে অগ্নিবর্ষণ করতে এসেছি। আরও ভালো হত, সে আগুন যদি আগেই প্রজ্বলিত হত!
[50] কিন্তু আমাকে এক বাপ্তিষ্মে বাপ্তিষ্ম গ্রহণ করতে হবে। তা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি কতই না যন্ত্রণাবিদ্ধ হচ্ছি!
[51] তোমরা কি মনে করো যে, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি? তা নয়, আমি তোমাদের বলছি, আমি দিতে এসেছি বিভেদ।
[52] এখন থেকে পরিবারের পাঁচজনের মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ দেখা যাবে। তিনজন যাবে দুজনের বিপক্ষে, দুজন তিনজনের বিপক্ষে।
[53] তারা হবে বিচ্ছিন্ন, পিতা পুত্রের এবং পুত্র পিতার বিপক্ষে, মাতা কন্যার ও কন্যা মাতার বিপক্ষে, শাশুড়ির বিপক্ষে যাবে পুত্রবধূ ও পুত্রবধূর বিপক্ষে যাবে শাশুড়ি।”
[54] তিনি সকলকে বললেন, “পশ্চিম আকাশে মেঘের উদয় হলে তোমরা সঙ্গে সঙ্গে বলো, ‘বৃষ্টি আসছে,’ আর তাই হয়।
[55] যখন দক্ষিণাবায়ু বইতে থাকে, তোমরা বলো, ‘এবার গরম পড়বে’ এবং সত্যিই গরম পড়ে।
[56] ভণ্ডের দল! তোমরা পৃথিবী ও আকাশের অবস্থা দেখে তার মর্মোদ্ধার করতে পারো, অথচ এই বর্তমানকালের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারো না, এ কেমন কথা?
[57] “কোনটি ন্যায্য, তা তোমরা নিজেরা বিচার করো না কেন?
[58] প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিচারকের কাছে যাওয়ার সময় পথেই তার সঙ্গে বিবাদের নিষ্পত্তির যথাসাধ্য চেষ্টা কোরো, না হলে সে তোমাকে বিচারকের কাছে টেনে নিয়ে যাবে; বিচারক তোমাকে তুলে দেবেন আধিকারিকের হাতে, আর আধিকারিক তোমাকে নিক্ষেপ করবেন কারাগারে।
[59] আমি তোমাকে বলছি, শেষ কপর্দকটি পরিশোধ না করা পর্যন্ত তুমি বাইরে আসতে পারবে না।”