[1] তখন, নিস্তারপর্ব নামে পরিচিত খামিরবিহীন রুটির পর্ব ক্রমশ এগিয়ে আসছিল।
[2] আর প্রধান যাজকেরা ও শাস্ত্রবিদরা যীশুর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পথ খুঁজছিলেন, কারণ তাঁরা জনসাধারণকে ভয় করছিলেন।
[3] শয়তান তখন সেই বারোজনের অন্যতম, ইষ্কারিয়োৎ নামে পরিচিত যিহূদার অন্তরে প্রবেশ করল।
[4] যিহূদা প্রধান যাজকবর্গ ও মন্দিরের প্রহরায় নিযুক্ত পদস্থ কর্মচারীদের কাছে গিয়ে, কীভাবে যীশুকে ধরিয়ে দেবে, তা নিয়ে আলোচনা করল।
[5] তাঁরা আনন্দিত হয়ে তাকে অর্থ দিতে সম্মত হলেন।
[6] সে-ও তাঁদের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে জনসাধারণের অগোচরে যীশুকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ খুঁজতে লাগল।
[7] অবশেষে খামিরবিহীন রুটির পর্বের দিন উপস্থিত হল। সেদিন নিস্তারপর্বের মেষ বলি দিতে হত।
[8] যীশু পিতর ও যোহনকে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, “যাও, আমাদের জন্য নিস্তারপর্বের ভোজের আয়োজন করো।”
[9] তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী চান? আমরা কোথায় এর আয়োজন করব?”
[10] তিনি উত্তর দিলেন, “তোমরা নগরে প্রবেশ করেই দেখতে পাবে, এক ব্যক্তি একটি জলের কলশি নিয়ে যাচ্ছে। তোমরা তাকে অনুসরণ করে যে বাড়িতে সে প্রবেশ করবে, সেখানে যেয়ো।
[11] তোমরা সেই বাড়ির গৃহকর্তাকে বোলো, ‘গুরুমহাশয় জানতে চান, অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট কামরাটি কোথায়, যেখানে আমি আমার শিষ্যদের নিয়ে নিস্তারপর্বের ভোজ গ্রহণ করতে পারি?’
[12] তিনি তোমাদের উপরতলার একটি সুসজ্জিত বড় কামরা দেখিয়ে দেবেন। সেখানেই সব আয়োজন কোরো।”
[13] তাঁরা বেরিয়ে পড়ে যীশুর কথামতো সবকিছুই দেখতে পেলেন এবং নিস্তারপর্বের ভোজ প্রস্তুত করলেন।
[14] লগ্ন উপস্থিত হলে যীশু ও প্রেরিতশিষ্যেরা আসনে হেলান দিয়ে বসলেন।
[15] আর তিনি তাঁদের বললেন, “যন্ত্রণাভোগের আগে আমি তোমাদের সঙ্গে নিস্তারপর্বের ভোজ গ্রহণ করার জন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করেছি।
[16] কারণ আমি তোমাদের বলছি, এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ঈশ্বরের রাজ্যে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত, আমি আর এই ভোজন গ্রহণ করব না।”
[17] পরে তিনি পানপাত্র তুলে নিয়ে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর বললেন, “এটি নাও ও তোমাদের মধ্যে বিভাগ করো।
[18] আমি তোমাদের বলছি, ঈশ্বরের রাজ্যের আগমন না হওয়া পর্যন্ত, আমি আর দ্রাক্ষারস পান করব না।”
[19] তাপর তিনি রুটি নিলেন, ধন্যবাদ দিলেন এবং ভেঙে নিয়ে তাঁদের দিলেন, আর বললেন, “এ তোমাদের জন্য উত্সর্গীকৃত আমার শরীর। আমার স্মরণার্থে তোমরা এরকম কোরো।”
[20] একইভাবে, ভোজনের পরে তিনি পানপাত্র নিয়ে বললেন, “এই পানপাত্র আমার রক্তে নতুন নিয়ম, এ তোমাদেরই জন্য পাতিত হয়েছে।
[21] কিন্তু যে আমাকে ধরিয়ে দিতে উদ্যত তার হাত আমারই সঙ্গে টেবিলের উপরে আছে।
[22] মনুষ্যপুত্র তাঁর নির্ধারিত পথেই প্রস্থান করবেন, কিন্তু ধিক্ সেই মানুষকে, যে তাঁকে শত্রুদের হাতে তুলে দেবে।”
[23] তাঁরা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন যে, তাঁদের মধ্যে কে এমন কাজ করতে পারেন।
[24] আর তাঁদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ, এ-নিয়েও একটি বিতর্ক দেখা দিল।
[25] যীশু তাঁদের বললেন, “অন্য অন্য জাতির রাজারা প্রজাদের উপরে প্রভুত্ব করে; তবুও যারা তাদের উপরে কর্তৃত্ব করে, তারা নিজেদের, তাদের হিতার্থী বলে অভিহিত করে।
[26] কিন্তু তোমরা সেইরকম হবে না। বরং, তোমাদের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ, তাকে হতে হবে কনিষ্ঠের মতো, প্রশাসককে হতে হবে এমন একজনের মতো যে সেবা করে।
[27] কারণ শ্রেষ্ঠ কে? যে ভোজনে বসে সে, না যে পরিবেশন করে, সে? যে ভোজনে বসে, সেই কি নয়? কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে পরিচারকের মতো আছি।
[28] আমার পরীক্ষার দিনগুলিতে, তোমরা বরাবর আমার সঙ্গে আছো।
[29] আমার পিতা যেমন আমাকে একটি রাজ্য অর্পণ করেছেন, আমিও তেমনই তোমাদের জন্য একটি রাজ্য নিরূপণ করছি,
[30] যেন তোমরা আমার রাজ্যে আমারই সঙ্গে পানাহার করতে ও সিংহাসনে আরোহণ করে ইস্রায়েলের দ্বাদশ গোষ্ঠীর বিচার করতে পারো।
[31] “শিমোন, শিমোন, শয়তান তোমাদের গমের মতো ঝাড়াই করার জন্য অনুমতি চেয়েছে।
[32] কিন্তু শিমোন, আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করেছি, যেন তোমার বিশ্বাস লোপ না পায়। আর তুমিও একবার ফিরে এলে তোমার ভাইদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার কোরো।”
[33] কিন্তু পিতর উত্তর দিলেন, “প্রভু, আমি আপনার সঙ্গে কারাগারে যেতে ও মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত আছি।”
[34] যীশু উত্তর দিলেন, “পিতর, আমি তোমাকে বলছি, আজ মোরগ ডাকার আগেই তুমি আমাকে চেনো না বলে তিনবার অস্বীকার করবে।”
[35] যীশু তারপর তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যখন তোমাদের টাকার থলি, ঝুলি, বা চটিজুতো ছাড়াই পাঠিয়েছিলাম, তখন তোমরা কি কোনো অভাববোধ করেছিলে?” তাঁরা উত্তর দিলেন, “না, কোনো কিছুরই নয়।”
[36] তিনি তাঁদের বললেন, “কিন্তু এখন তোমাদের কাছে টাকার থলি থাকলে সঙ্গে নিয়ো, একটি ঝুলিও নিয়ো; যদি তোমাদের তরোয়াল না থাকে, তাহলে পোশাক বিক্রি করে তা কিনে নিয়ো।
[37] কারণ লেখা আছে: ‘আর তিনি অপরাধীদের সঙ্গে গণিত হলেন’; আর আমি তোমাদের বলছি, এটি আমার জীবনে অবশ্যই পূর্ণ হবে। আমার সম্পর্কে যা লেখা আছে, তার পূর্ণতা সমাসন্ন।”
[38] শিষ্যেরা বললেন, “প্রভু দেখুন, এখানে দুটি তরোয়াল আছে।” তিনি উত্তর দিলেন, “তাই যথেষ্ট।”
[39] যীশু অভ্যাসমতোই জলপাই পর্বতে গেলেন। শিষ্যেরা তাঁকে অনুসরণ করলেন।
[40] সেই স্থানে তিনি উপস্থিত হয়ে তাঁদের বললেন, “তোমরা যেন প্রলোভনে না পড়ো, সেজন্য প্রার্থনা করো।”
[41] তিনি তাঁদের কাছ থেকে এক-ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে গিয়ে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করলেন,
[42] “পিতা, তোমার ইচ্ছা হলে আমার কাছ থেকে এই পানপাত্র সরিয়ে নাও। তবুও আমার ইচ্ছা নয়, তোমারই ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”
[43] তখন স্বর্গের এক দূত তাঁর কাছে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে শক্তি জোগালেন।
[44] নিদারুণ যন্ত্রণায়, তিনি প্রার্থনায় আরও একাগ্র হলেন; তাঁর ঘাম রক্তের বড় বড় ফোঁটার মতো মাটিতে ঝরে পড়ছিল।
[45] প্রার্থনা থেকে উঠে তিনি শিষ্যদের কাছে ফিরে গিয়ে দেখলেন, তাঁরা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
[46] তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা ঘুমাচ্ছ কেন? ওঠো, প্রার্থনা করো, যেন তোমরা প্রলোভনে না পড়ো।”
[47] তিনি তখনও কথা বলছেন, এমন সময় একদল লোক উঠে এল। তাদের সঙ্গে এল সেই বারোজনের অন্যতম যিহূদা। সে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে চুম্বন করার জন্য যীশুর কাছে এগিয়ে এল।
[48] কিন্তু যীশু তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “যিহূদা, তুমি কি চুম্বন করে মনুষ্যপুত্রকে শত্রুদের হাতে সমর্পণ করছ?”
[49] যীশুর অনুগামীরা যখন দেখলেন কী ঘটতে যাচ্ছে, তাঁরা বললেন, “প্রভু, আমাদের তরোয়াল দিয়ে কি আঘাত করব?”
[50] তাঁদের মধ্যে একজন মহাযাজকের দাসকে আঘাত করে তার ডানদিকের কান কেটে ফেললেন।
[51] কিন্তু যীশু উত্তর দিলেন, “এমন যেন আর না ঘটে।” আর তিনি সেই লোকটির কান স্পর্শ করে তাকে সুস্থ করে দিলেন।
[52] আর যে প্রধান যাজকবর্গ, মন্দিরের প্রহরীদলের অধ্যক্ষেরা ও প্রাচীনবৃন্দ যীশুর উদ্দেশে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের বললেন, “আমি কি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছি যে, আপনারা তরোয়াল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছেন?
[53] আমি মন্দির-প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই আপনাদের মধ্যে ছিলাম। তখন আপনারা আমার উপরে হস্তক্ষেপ করেননি। কিন্তু এই হল আপনাদের সুসময়, কারণ এখন অন্ধকারেরই রাজত্ব।”
[54] যীশুকে বন্দি করে তারা তাঁকে মহাযাজকের বাড়িতে নিয়ে গেল। পিতর দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করলেন।
[55] কিন্তু প্রাঙ্গণের মাঝখানে তারা যখন আগুন জ্বেলে একসঙ্গে বসল, পিতরও তাদের সঙ্গে বসলেন।
[56] একজন দাসী আগুনের আলোয় তাঁকে সেখানে বসে থাকতে দেখল। সে তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল, “এই লোকটিও ওর সঙ্গে ছিল।”
[57] কিন্তু তিনি অস্বীকার করে বললেন, “নারী, আমি ওঁকে চিনি না।”
[58] অল্প কিছুক্ষণ পরে আর একজন তাঁকে দেখে বলল, “তুমিও ওদের একজন।” পিতর বললেন, “ওহে, আমি নই।”
[59] প্রায় এক ঘণ্টা পরে আরও একজন দৃঢ়ভাবে বলল, “নিঃসন্দেহে, এই লোকটিও তার সঙ্গে ছিল, কারণ এ একজন গালীলীয়।”
[60] পিতর উত্তর দিলেন, “ওহে, তুমি কী বলছ, আমি বুঝতে পারছি না।” তিনি কথা বলছিলেন, এমন সময় মোরগ ডেকে উঠল।
[61] প্রভু ফিরে সোজা পিতরের দিকে তাকালেন। তখন প্রভু তাঁকে যে কথা বলেছিলেন, পিতরের তা স্মরণ হল: “আজ মোরগ ডাকার আগেই তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে।”
[62] তখন পিতর বাইরে গিয়ে তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
[63] যারা যীশুর প্রহরায় নিযুক্ত ছিল, তারা তাঁকে বিদ্রুপ ও প্রহার করতে লাগল।
[64] তাঁর চোখ বেঁধে দিয়ে তারা জিজ্ঞাসা করল, “ভাববাণী বল দেখি, কে তোকে মারল?”
[65] তারা তাঁকে আরও অনেক অপমানসূচক কথা বলল।
[66] সকাল হলে সেই জাতির প্রাচীনবর্গ, দুই প্রধান যাজক ও শাস্ত্রবিদদের মন্ত্রণা পরিষদ সমবেত হলেন। যীশুকে তাঁদের সামনে হাজির করা হল।
[67] তাঁরা বললেন, “তুমি যদি সেই খ্রীষ্ট হও, আমাদের তা বলো।” যীশু উত্তর দিলেন, “আমি আপনাদের বললে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না।
[68] আর আমি যদি আপনাদের প্রশ্ন করি, আপনারাও উত্তর দেবেন না।
[69] কিন্তু এখন থেকে, মনুষ্যপুত্র পরাক্রান্ত ঈশ্বরের ডানদিকে উপবিষ্ট থাকবেন।”
[70] তাঁরা সবাই প্রশ্ন করলেন, “তাহলে, তুমিই কি ঈশ্বরের পুত্র?” তিনি বললেন, “আপনারা ঠিক কথাই বলছেন, আমিই তিনি।”
[71] তখন তাঁরা বললেন, “আর আমাদের সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন কী? আমরা নিজেরাই তো ওর মুখ থেকে একথা শুনেছি!”