[1] তখন সমবেত জমায়েত সকলে উঠে তাঁকে পীলাতের কাছে নিয়ে গেল।
[2] তারা যীশুকে অভিযুক্ত করে বলল, “আমরা দেখেছি, এই লোকটি আমাদের জাতিকে ধ্বংস করতে চাইছে। সে কৈসরকে কর দিতে নিষেধ করে, আর নিজেকে খ্রীষ্ট, একজন রাজা বলে দাবি করে।”
[3] পীলাত তাই যীশুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি ইহুদিদের রাজা?” যীশু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আপনি যে-রকম বলছেন, সেরকমই।”
[4] পীলাত তখন প্রধান যাজকবর্গ ও লোকদের কাছে ঘোষণা করলেন, “এই মানুষটিকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো দোষ আমি খুঁজে পেলাম না।”
[5] কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলল, “ও তার শিক্ষায় সমগ্র যিহূদিয়ার লোকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। গালীল থেকে শুরু করে ও এখানেও এসে পৌঁছেছে।”
[6] একথা শুনে পীলাত জানতে চাইলেন, লোকটি গালীলীয় কি না।
[7] তিনি যখন জানতে পারলেন যে, যীশু হেরোদের শাসনাধীন, তিনি তাঁকে হেরোদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সেই সময় হেরোদও জেরুশালেমে ছিলেন।
[8] যীশুকে দেখে হেরোদ অত্যন্ত প্রীত হলেন, কারণ দীর্ঘকাল যাবৎ তিনি তাঁকে দেখতে চাইছিলেন। তিনি যীশুর সম্পর্কে যা শুনেছিলেন, সেইমতো আশা করছিলেন, তাঁকে কোনো অলৌকিক চিহ্নকর্ম করতে দেখবেন।
[9] তিনি তাঁকে বহু প্রশ্ন করলেন, কিন্তু যীশু তাঁকে কোনও উত্তর দিলেন না।
[10] প্রধান যাজকবৃন্দ ও শাস্ত্রবিদরা সেখানে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ডভাবে তাঁর বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে লাগলেন।
[11] তখন হেরোদ ও তাঁর সেনারা তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করলেন। এক জমকালো পোশাক পরিয়ে যীশুকে তাঁরা পীলাতের কাছে ফেরত পাঠালেন।
[12] সেদিন হেরোদ ও পীলাত মিত্রতায় আবদ্ধ হলেন, কারণ এর আগে তাঁরা পরস্পরের শত্রু ছিলেন।
[13] পীলাত প্রধান যাজকদের, সমাজভবনের অধ্যক্ষদের ও জনসাধারণকে একসঙ্গে ডেকে তাদের বললেন,
[14] “বিদ্রোহের জন্য লোকদের উত্তেজিত করার অভিযোগে তোমরা এই লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসেছ। তোমাদের সাক্ষাতে আমি তাকে পরীক্ষা করেছি, কিন্তু তার বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি খুঁজে পাইনি।
[15] আর হেরোদও পাননি, কারণ তিনি তাকে আমার কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন। তোমরা দেখতেই পাচ্ছ, মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য কোনো অপরাধই সে করেনি।
[16] তাই, আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব।”
[17] সেই পর্বের সময়ে তাঁকে, তাদের জন্য একজন ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতেই হত।
[18] তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, “এই লোকটিকে দূর করুন। আমরা বারাব্বার মুক্তি চাই।”
[19] (নগরে বিদ্রোহের চেষ্টা ও হত্যার অপরাধে বারাব্বাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল)
[20] যীশুকে মুক্ত করার অভিপ্রায়ে পীলাত তাদের কাছে আবার অনুরোধ করলেন।
[21] কিন্তু তারা চিৎকার করতে লাগল, “ওকে ক্রুশে দিন! ওকে ক্রুশে দিন!”
[22] তিনি তৃতীয়বার তাদের কাছে বললেন, “কেন? এই মানুষটি কী অপরাধ করেছে? মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো কোনো কারণই আমি এর মধ্যে খুঁজে পাইনি। সেইজন্য আমি ওকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব।”
[23] কিন্তু তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করার অনড় দাবিতে তারা উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত তাদের চিত্কারেরই জয় হল।
[24] তাই পীলাত তাদের দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
[25] বিদ্রোহ ও হত্যার অভিযোগে যে লোকটি কারারুদ্ধ হয়েছিল ও যাকে তারা চেয়েছিল, তিনি তাকে মুক্তি দিলেন এবং তাদের ইচ্ছার কাছে তিনি যীশুকে সমর্পণ করলেন।
[26] যীশুকে নিয়ে এগিয়ে চলার পথে কুরীণের অধিবাসী শিমোনকে তারা ধরল। সে আসছিল গ্রামাঞ্চল থেকে। তারা ক্রুশটি তার উপরে চাপিয়ে দিয়ে যীশুর পেছন পেছন সেটি বয়ে নিয়ে যেতে তাকে বাধ্য করল।
[27] বিস্তর লোক তাঁকে অনুসরণ করছিল। সেই সঙ্গে ছিল কিছু নারীও, যারা তাঁর জন্য শোক ও বিলাপ করছিল।
[28] যীশু ফিরে তাদের উদ্দেশে বললেন, “ওগো জেরুশালেমের কন্যারা, আমার জন্য তোমরা কেঁদো না, কিন্তু নিজেদের জন্য ও তোমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য কাঁদো।
[29] কারণ এমন সময় আসবে, যখন তোমরা বলবে, ‘ধন্য সেই বন্ধ্যা নারীরা, যাদের গর্ভ কোনোদিন সন্তানধারণ করেনি, যারা কোনোদিন স্তন্যদুগ্ধ পান করায়নি।’
[30] তখন “ ‘পর্বতসকলের উদ্দেশে তারা বলবে, “আমাদের উপরে পড়ো!” আর পাহাড়গুলিকে বলবে, “আমাদের আবৃত করে রাখো!” ’
[31] গাছ সতেজ থাকার সময়ই মানুষ যদি এরকম আচরণ করে, তাহলে গাছ যখন শুকিয়ে যাবে, তখন আরও কি-না ঘটবে!”
[32] আরও দুজন দুষ্কৃতীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
[33] করোটি নামক স্থানে উপস্থিত হয়ে তারা তাঁকে সেই দুষ্কৃতীদের সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ করল, একজনকে তাঁর ডানদিকে, অন্যজনকে তাঁর বাঁদিকে।
[34] যীশু বললেন, “পিতা, এদের ক্ষমা করো, কারণ এরা জানে না, এরা কী করছে।” আর গুটিকাপাত করে তারা তাঁর পোশাক ভাগ করে নিল।
[35] লোকেরা দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। এমনকি, সমাজভবনের অধ্যক্ষরাও তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করল। তারা বলল, “ও অপরকে উদ্ধার করেছে; ও যদি ঈশ্বরের সেই খ্রীষ্ট, সেই মনোনীত জন হয়, তাহলে এখন নিজেকে উদ্ধার করুক!”
[36] সৈন্যেরাও উঠে এসে তাঁকে বিদ্রুপ করল। তারা তাঁকে সিরকা দিয়ে বলল,
[37] “তুমি যদি ইহুদিদের রাজা হও, তাহলে নিজেকে বাঁচাও।”
[38] তাঁর মাথার উপরে একটি লিখিত বিজ্ঞপ্তি ছিল। তাতে লেখা ছিল, “এই ব্যক্তি ইহুদিদের রাজা।”
[39] ক্রুশার্পিত দুষ্কৃতীদের একজন তাঁকে কটূক্তি করে বলল, “তুমিই কি সেই খ্রীষ্ট নও? নিজেকে আর আমাদের বাঁচাও!”
[40] কিন্তু অপর দুষ্কৃতী তাকে তিরস্কার করে বলল, “তুমি কি ঈশ্বরকেও ভয় করো না? তুমিও তো সেই একই দণ্ডভোগ করছ।
[41] আমরা ন্যায়সঙ্গত দণ্ডভোগ করছি, আমরা যা করেছি, তারই সমুচিত ফলভোগ করছি। কিন্তু এই মানুষটি কোনও অন্যায় করেননি।”
[42] তারপর সে বলল, “যীশু, আপনি যখন স্বরাজ্যে আসবেন, তখন আমাকে স্মরণ করবেন।”
[43] যীশু তাকে উত্তর দিলেন, “আমি তোমাকে সত্যিই বলছি, আজই তুমি আমার সঙ্গে পরমদেশে উপস্থিত হবে।”
[44] তখন দুপুর প্রায় বারোটা। সেই সময় থেকে বিকেল তিনটে পর্যন্ত সমস্ত দেশের উপরে অন্ধকার ছেয়ে রইল।
[45] সূর্যের আলো নির্বাপিত হল। আর মন্দিরের যবনিকা ছিঁড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল।
[46] যীশু উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, “পিতা, তোমার হাতে আমি আমার আত্মা সমর্পণ করি।” একথা বলে তিনি তাঁর শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন।
[47] সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করে শতসেনাপতি ঈশ্বরের প্রশংসা করে বললেন, “এই মানুষটি নিঃসন্দেহে ধার্মিক ছিলেন।”
[48] এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য যারা সমবেত হয়েছিল, তারা তা দেখে বক্ষে করাঘাত করতে করতে ফিরে গেল।
[49] কিন্তু তাঁর পরিচিতজনেরা এবং গালীলের যে মহিলারা তাঁকে অনুসরণ করছিলেন, তারা দূরে দাঁড়িয়ে এই সমস্ত ঘটনা লক্ষ্য করছিলেন।
[50] এখন যোষেফ নামে মহাসভার এক সদস্য সেখানে ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ।
[51] তিনি তাদের সিদ্ধান্তে ও কাজকর্মে সহমত ছিলেন না। তিনি ছিলেন যিহূদিয়ার আরিমাথিয়া নগরের অধিবাসী। তিনি ঈশ্বরের রাজ্যের আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলেন।
[52] তিনি পীলাতের কাছে গিয়ে যীশুর দেহটি চেয়ে নিলেন।
[53] তিনি তা ক্রুশ থেকে নামিয়ে একখণ্ড ক্ষৌমবস্ত্রে দেহটি জড়িয়ে, পাহাড় কেটে তৈরি করা একটি সমাধিতে রাখলেন। সেখানে সে-পর্যন্ত আর কাউকে সমাধি দেওয়া হয়নি।
[54] সেদিনটি ছিল “প্রস্তুতির দিন,” বিশ্রামবার শুরু হতে অল্প কিছুক্ষণ বাকি ছিল।
[55] গালীল থেকে যীশুর সঙ্গে আগত মহিলারা যোষেফকে অনুসরণ করে সমাধি স্থানটি ও কীভাবে তাঁর দেহটি রাখা হল, তা দেখলেন।
[56] তারপর তাঁরা বাড়ি ফিরে বিভিন্ন রকম মশলা ও সুগন্ধি-দ্রব্য প্রস্তুত করলেন। কিন্তু বিধানের প্রতি বাধ্যতায় তাঁরা বিশ্রামদিনে বিশ্রাম করলেন।