[1] এসব বিষয় বলা শেষ করার পর যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন,
[2] “তোমরা জানো, আর দুদিন পরে নিস্তারপর্ব আসছে, তখন মনুষ্যপুত্রকে ক্রুশার্পিত করার জন্য সমর্পণ করা হবে।”
[3] সেই সময় প্রধান যাজকেরা ও লোকেদের প্রাচীনবর্গ কায়াফা নামক মহাযাজকের প্রাসাদে সমবেত হলেন।
[4] আর তাঁরা কোনও ছলে যীশুকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করলেন।
[5] তাঁরা বললেন, “কিন্তু পর্বের সময়ে নয়, তাতে লোকদের মধ্যে দাঙ্গা বেধে যেতে পারে।”
[6] যীশু যখন বেথানিতে কুষ্ঠরোগী শিমোনের বাড়িতে ছিলেন,
[7] একজন নারী শ্বেতস্ফটিকের পাত্রে বহুমূল্য সুগন্ধি তেল নিয়ে এল। যীশু যখন ভোজনের টেবিলে হেলান দিয়ে বসেছিলেন, সেই নারীটি তাঁর মাথায় তা উপুড় করে ঢেলে দিল।
[8] শিষ্যেরা এই দেখে ভীষণ রুষ্ট হলেন। তাঁরা বললেন, “এই অপচয় কেন?
[9] এই সুগন্ধি তেল তো অনেক টাকায় বিক্রি করে দরিদ্রদের দান করা যেত!”
[10] একথা শুনে যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরা কেন এই মহিলাকে বিরক্ত করছ? সে তো আমার জন্য এক ভালো কাজই করেছে।
[11] দরিদ্রেরা তোমাদের সঙ্গে সবসময়ই থাকবে, কিন্তু আমাকে তোমরা সবসময় পাবে না।
[12] সে আমার শরীরে এই সুগন্ধি তেল ঢেলে আমাকে সমাধির উদ্দেশে প্রস্তুত করল।
[13] আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, সমস্ত জগতে যেখানেই এই সুসমাচারের কথা প্রচারিত হবে, সে যা করেছে, স্মৃতির উদ্দেশে তার সেই কর্মের কথাও বলা হবে।”
[14] তখন সেই বারোজনের মধ্যে একজন, যে যিহূদা ইষ্কারিয়োৎ নামে আখ্যাত, সে প্রধান যাজকদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
[15] “যীশুকে আপনাদের হাতে সমর্পণ করলে, আপনারা আমাকে কী দেবেন?” তাঁরা তাকে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গণনা করে দিলেন।
[16] সেই সময় থেকে যিহূদা তাঁকে সমর্পণ করার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগল।
[17] খামিরবিহীন রুটির পর্বের প্রথম দিনে, শিষ্যেরা যীশুর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “নিস্তারপর্বের ভোজ গ্রহণের প্রস্তুতি কোথায় আমরা করব?”
[18] তিনি উত্তর দিলেন, “তোমরা নগরে জনৈক ব্যক্তির কাছে যাও ও তাকে বলো, ‘গুরুমহাশয় বলছেন, আমার জন্য নির্ধারিত সময় এসে গেছে। আমি তোমার গৃহে আমার শিষ্যদের সঙ্গে নিস্তারপর্ব পালন করতে চাই।’ ”
[19] তাই শিষ্যেরা যীশুর নির্দেশমতো কাজ করলেন ও গিয়ে নিস্তারপর্বের ভোজ প্রস্তুত করলেন।
[20] সন্ধ্যা হলে, যীশু সেই বারোজনের সঙ্গে ভোজের টেবিলে হেলান দিয়ে বসলেন।
[21] তাঁরা ভোজন করছেন, এমন সময়ে যীশু বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমাদের মধ্যে একজন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।”
[22] তাঁরা ভীষণ দুঃখিত হলেন ও একের পর এক তাঁকে বললেন, “প্রভু, সে নিশ্চয়ই আমি নই?”
[23] যীশু উত্তর দিলেন, “যে আমার সঙ্গে ভোজনপাত্রে হাত ডুবালো, সেই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।
[24] মনুষ্যপুত্রের বিষয়ে যে-রকম লিখিত আছে, তেমনই তিনি চলে যাবেন, কিন্তু ধিক্ সেই মানুষ, যে মনুষ্যপুত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে! তার জন্ম না হলেই বরং তার পক্ষে ভালো হত।”
[25] তখন, যে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, সেই যিহূদা বলল, “রব্বি, সে নিশ্চয়ই আমি নই?” যীশু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, তুমিই সে।”
[26] তাঁদের ভোজ গ্রহণের সময়, যীশু রুটি নিলেন, ধন্যবাদ দিলেন ও তা ভাঙ্গলেন। আর তিনি তাঁর শিষ্যদের দিলেন ও বললেন, “তোমরা নাও, এবং ভোজন করো; এ আমার শরীর।”
[27] তারপর তিনি পানপাত্র নিলেন, ধন্যবাদ দিলেন ও শিষ্যদের তা দিয়ে বললেন, “তোমরা সবাই এর থেকে পান করো।
[28] এ আমার রক্ত, সেই নতুন নিয়মের রক্ত, যা পাপক্ষমার উদ্দেশে অনেকের জন্য পাতিত হচ্ছে।
[29] আমি তোমাদের বলছি, এখন থেকে আমি এই দ্রাক্ষারস আর কখনও পান করব না, সেইদিন পর্যন্ত, যখন আমি আপন পিতার রাজ্যে তোমাদের সঙ্গে ইহা নতুন করে পান করব।”
[30] এরপর, তাঁরা এক গীত গেয়ে জলপাই পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
[31] তারপর যীশু তাঁদের বললেন, “এই রাত্রিতে তোমরা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, কারণ এরকম লিখিত আছে, “ ‘আমি পালরক্ষককে আঘাত করব, তাতে পালের মেষেরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।’
[32] কিন্তু আমি উত্থিত হলে পর, আমি তোমাদের আগেই গালীলে পৌঁছাব।”
[33] পিতর উত্তর দিলেন, “সবাই আপনাকে ছেড়ে চলে গেলেও, আমি কিন্তু কখনও যাব না।”
[34] প্রত্যুত্তরে যীশু বললেন, “আমি তোমাকে সত্যিই বলছি, আজ রাত্রে, মোরগ ডাকার আগেই, তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।”
[35] কিন্তু পিতর তাঁকে বললেন, “আমাকে যদি আপনার সঙ্গে মরতেও হয়, আমি কখনও আপনাকে অস্বীকার করব না।” অন্য সব শিষ্যও একই কথা বললেন।
[36] তারপর যীশু তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে গেৎশিমানি নামে এক স্থানে গেলেন। তিনি তাঁদের বললেন, “আমি যতক্ষণ ওখানে প্রার্থনা করি তোমরা ততক্ষণ এখানে বসে থাকো।”
[37] তিনি পিতর ও সিবদিয়ের দুই পুত্রকে তাঁর সঙ্গে নিলেন। তিনি ক্রমেই দুঃখার্ত ও ব্যাকুল হতে লাগলেন।
[38] তারপর তিনি তাঁদের বললেন, “আমার প্রাণ মৃত্যু পর্যন্ত দুঃখার্ত হয়েছে। তোমরা এখানে থাকো, আমার সঙ্গে জেগে থাকো।”
[39] আরও কিছু দূর এগিয়ে, তিনি ভূমিতে উবুড় হয়ে প্রার্থনা করলেন, “পিতা, যদি সম্ভব হয়, এই পানপাত্র আমার কাছ থেকে দূর করে দাও। তবুও আমার ইচ্ছামতো নয়, কিন্তু তোমারই ইচ্ছামতো হোক।”
[40] তারপর তিনি শিষ্যদের কাছে ফিরে দেখলেন, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি পিতরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি এক ঘণ্টাও আমার সঙ্গে জেগে থাকতে পারলে না?
[41] জেগে থাকো ও প্রার্থনা করো, যেন তোমরা প্রলোভনে না পড়ো। আত্মা ইচ্ছুক, কিন্তু শরীর দুর্বল।”
[42] তিনি দ্বিতীয়বার গিয়ে প্রার্থনা করলেন, “পিতা আমার, আমি পান না করলে যদি এই পাত্র দূর না হয়, তাহলে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।”
[43] তিনি ফিরে এসে আবার তাঁদের ঘুমাতে দেখলেন, কারণ তাঁদের চোখ ভারী হয়ে পড়েছিল।
[44] তাই তিনি পুনরায় তাঁদের ছেড়ে এগিয়ে গেলেন ও একই কথা বলে তৃতীয়বার প্রার্থনা করলেন।
[45] তারপর তিনি শিষ্যদের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, “তোমরা কি এখনও ঘুমিয়ে আছো ও বিশ্রাম গ্রহণ করছ? দেখো, সময় হয়ে এসেছে, আর মনুষ্যপুত্রকে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাপীদের হাতে সমর্পণ করা হচ্ছে।
[46] ওঠো, চলো আমরা যাই! ওই দেখো, আমার বিশ্বাসঘাতক এসে পড়েছে!”
[47] তিনি তখনও কথা বলছেন সেই সময় বারোজনের অন্যতম যিহূদা সেখানে এসে উপস্থিত হল। তার সঙ্গে ছিল অনেক লোক। তাদের হাতে ছিল তরোয়াল ও লাঠিসোঁটা। প্রধান যাজকেরা ও লোকসমূহের প্রাচীনবর্গ তাদের পাঠিয়েছিলেন।
[48] সেই বিশ্বাসঘাতক তাদের এই সংকেত দিয়ে রেখেছিল, “যাকে আমি চুম্বন করব, সেই ওই ব্যক্তি; তাকে গ্রেপ্তার কোরো।”
[49] সেই মুহূর্তেই যীশুর কাছে গিয়ে যিহূদা বলল, “রব্বি, নমস্কার!” বলে তাঁকে চুম্বন করল।
[50] যীশু উত্তর দিলেন, “বন্ধু, যা করতে এসেছ, তুমি তাই করো।” তখন সেই লোকেরা এগিয়ে এসে যীশুকে ধরল ও তাঁকে গ্রেপ্তার করল।
[51] তাই দেখে যীশুর সঙ্গীদের একজন তাঁর তরোয়াল বের করে মহাযাজকের দাসকে আঘাত করে তার কান কেটে ফেললেন।
[52] যীশু তাঁকে বললেন, “তোমার তরোয়াল পুনরায় স্বস্থানে রাখো, কারণ যারাই তরোয়াল ধারণ করে তারাই তরোয়ালের দ্বারা মৃত্যুবরণ করবে।
[53] তুমি কি মনে করো, আমি কি আমার পিতাকে ডাকতে পারি না, আর তিনি সঙ্গে সঙ্গে কি আমার অধীনে দ্বাদশ বাহিনীরও বেশি দূত পাঠিয়ে দেবেন না?
[54] তাহলে শাস্ত্রবাণী কীভাবে পূর্ণ হবে, যা বলে যে, এ-সবই এভাবে ঘটবে?”
[55] সেই সময় যীশু লোকদের বললেন, “আমি কি কোনও বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছি যে, তোমরা তরোয়াল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাকে ধরতে এসেছ? প্রতিদিন আমি মন্দিরচত্বরে বসে শিক্ষা দিয়েছি, তোমরা তো তখন আমাকে গ্রেপ্তার করোনি।
[56] কিন্তু এ সমস্ত এজন্যই ঘটছে, যেন ভাববাদীদের লিখিত বচনগুলি পূর্ণ হয়।” তখন সব শিষ্য তাঁকে ত্যাগ করে পালিয়ে গেল।
[57] যারা যীশুকে গ্রেপ্তার করেছিল, তারা তাঁকে মহাযাজক কায়াফার কাছে নিয়ে গেল। সেখানে সব শাস্ত্রবিদ ও লোকদের প্রাচীনবর্গ সমবেত হয়েছিলেন।
[58] কিন্তু পিতর দূর থেকে, মহাযাজকের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত যীশুকে অনুসরণ করলেন। তিনি প্রবেশ করে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার জন্য রক্ষীদের কাছে গিয়ে বসলেন।
[59] প্রধান যাজকেরা ও সমস্ত মহাসভা যীশুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষীদের খোঁজ করছিলেন।
[60] বহু মিথ্যাসাক্ষী এগিয়ে এলেও তাঁরা তেমন কাউকে পেলেন না। শেষে দুজন এগিয়ে
[61] এসে বলল, “এই লোকটি বলেছিল, ‘আমি ঈশ্বরের মন্দির ভেঙে ফেলতে ও তিনদিনের মধ্যে তা পুনর্নির্মাণ করতে পারি।’ ”
[62] তখন মহাযাজক উঠে দাঁড়িয়ে যীশুকে বললেন, “তুমি কি উত্তর দেবে না? এই লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ নিয়ে এসেছে, এগুলি কী?”
[63] যীশু তবুও নীরব রইলেন। মহাযাজক তাঁকে বললেন, “আমি জীবন্ত ঈশ্বরের নামে শপথ করে তোমাকে অভিযোগ করছি: আমাদের বলো দেখি, তুমি-ই কি সেই খ্রীষ্ট, ঈশ্বরের পুত্র?”
[64] যীশু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই, যেমন আপনি বলছেন। কিন্তু আমি আপনাদের সবাইকে বলছি: ভাবীকালে আপনারা মনুষ্যপুত্রকে সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ডানদিকে বসে থাকতে ও আকাশের মেঘে করে আসতে দেখবেন।”
[65] তখন মহাযাজক তাঁর কাপড় ছিঁড়ে ফেলে বললেন, “ও ঈশ্বরনিন্দা করেছে! আমাদের আর সাক্ষীর কী প্রয়োজন? দেখো, এখন তোমরা ঈশ্বরনিন্দা শুনলে।
[66] তোমরা কী মনে করো?” তাঁরা উত্তর দিলেন, “ও মৃত্যুরই যোগ্য।”
[67] তারা তখন তাঁর মুখে থুতু দিল ও তাঁকে ঘুসি মারল।
[68] অন্যেরা তাঁকে চড় মেরে বলতে লাগল, “ওরে খ্রীষ্ট, আমাদের কাছে ভাববাণী বল, কে তোকে মারল?”
[69] সেই সময় পিতর বাইরের উঠানে বসেছিলেন। একজন দাসী তাঁর কাছে এসে বলল, “তুমিও সেই গালীলীয় যীশুর সঙ্গে ছিলে।”
[70] কিন্তু তিনি তাদের সবার সামনে সেকথা অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, “আমি জানি না, তুমি কী বলছ।”
[71] তখন তিনি ফটকের কাছে গেলেন। সেখানে অন্য একজন দাসী তাঁকে দেখে, সেখানকার লোকজনকে বলল, “এই লোকটিও নাসরতীয় যীশুর সঙ্গে ছিল।”
[72] তিনি শপথ করে আবার তা অস্বীকার করলেন, বললেন, “আমি ওই মানুষটিকে চিনি না!”
[73] আরও কিছুক্ষণ পরে, যারা সেখানে দাঁড়িয়েছিল, তারা পিতরের কাছে গিয়ে বলল, “নিশ্চিতরূপে তুমি তাদেরই একজন, কারণ তোমার উচ্চারণভঙ্গিই তা প্রকাশ করছে।”
[74] তখন তিনি নিজের উপরে অভিশাপ ডেকে এনে তাদের কাছে শপথ করে বললেন, “আমি ওই মানুষটিকে চিনিই না!” সেই মুহূর্তে একটি মোরগ ডেকে উঠল।
[75] তখন যীশু যে কথা বলেছিলেন, তা পিতরের মনে পড়ল, “মোরগ ডাকার পূর্বে তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।” আর তিনি বাইরে গিয়ে খুব কাঁদতে লাগলেন।