[1] কিন্তু যীশু জলপাই পর্বতে চলে গেলেন।
[2] প্রত্যুষে যীশু আবার মন্দির-প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন। সেখানে সমস্ত লোক তাঁর চারপাশে সমবেত হলে তিনি উপবেশন করে তাদের শিক্ষাদান করলেন।
[3] তখন শাস্ত্রবিদ এবং ফরিশীরা ব্যভিচারে ধৃত এক নারীকে নিয়ে এলেন। সকলের সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে
[4] তাঁরা যীশুকে বললেন, “গুরুমহাশয়, এই স্ত্রীলোকটি ব্যভিচার করার মুহূর্তে ধরা পড়েছে।
[5] মোশি তাঁর বিধানে এই ধরনের স্ত্রীলোককে পাথর মারার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?”
[6] তাঁরা এই প্রশ্নটি ফাঁদ হিসাবে প্রয়োগ করলেন, যেন যীশুকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো সূত্র পেতে পারেন। কিন্তু যীশু নত হয়ে তাঁর আঙুল দিয়ে মাটিতে লিখতে লাগলেন।
[7] তাঁরা যখন তাঁকে বারবার প্রশ্ন করছিলেন, তিনি সোজা হয়ে তাঁদের বললেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিষ্পাপ থাকে, তাহলে প্রথমে সেই তাকে পাথর মারুক,”
[8] বলে তিনি আবার নত হয়ে মাটিতে লিখতে লাগলেন।
[9] যারা একথা শুনল তারা, প্রবীণদের থেকে শুরু করে শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত একে একে সরে পড়তে লাগল। সেখানে শুধু যীশু রইলেন, আর দণ্ডায়মান সেই নারী।
[10] যীশু সোজা হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নারী, ওরা সব গেল কোথায়? কেউ কি তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি?”
[11] সে বলল, “একজনও নয়, প্রভু।” যীশু বললেন, “তাহলে আমিও তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করি না। এখন যাও, আর কখনও পাপ কোরো না।”
[12] লোকদের আবার শিক্ষা দেওয়ার সময় যীশু বললেন, “আমি জগতের জ্যোতি। যে আমাকে অনুসরণ করে, সে কখনও অন্ধকারে পরিভ্রমণ করবে না, বরং সে জীবনের দীপ্তি লাভ করবে।”
[13] ফরিশীরা তাঁর প্রতিবাদ করে বলল, “আপনি তো নিজেই নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, আপনার সাক্ষ্য বৈধ নয়।”
[14] যীশু উত্তর দিলেন, “নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেও আমার সাক্ষ্য বৈধ, কারণ আমি কোথা থেকে এসেছি, আর কোথায় যাচ্ছি, তা আমি জানি। কিন্তু আমি কোথা থেকে এসেছি বা কোথায় যাচ্ছি, সে বিষয়ে আপনাদের কোনো ধারণা নেই।
[15] আপনারা মানুষের মানদণ্ডে বিচার করেন; আমি কারও বিচার করি না।
[16] কিন্তু যদি আমি বিচার করি, আমার রায় যথার্থ, কারণ আমি একা নই। যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, আমার সেই পিতা আমার সহবর্তী।
[17] তোমাদের নিজেদের বিধানশাস্ত্রে লিখিত আছে যে, দুজন লোকের সাক্ষ্য বৈধ।
[18] আমার সাক্ষী আমি স্বয়ং, অপর সাক্ষী হলেন পিতা, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।”
[19] তারা তখন যীশুকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার পিতা কোথায়?” যীশু উত্তর দিলেন, “তোমরা আমাকে বা আমার পিতাকে জানো না। যদি তোমরা আমাকে জানতে, তাহলে আমার পিতাকেও জানতে।”
[20] যেখানে দান উত্সর্গ করা হত, সেই স্থানের নিকটবর্তী মন্দির-প্রাঙ্গণে শিক্ষা দেওয়ার সময়, যীশু এই সমস্ত কথা বললেন। তবুও কেউ তাঁকে গ্রেপ্তার করল না, কারণ তাঁর সময় তখনও আসেনি।
[21] যীশু আর একবার তাদের বললেন, “আমি চলে যাচ্ছি, আর তোমরা আমাকে খুঁজে বেড়াবে, কিন্তু তোমাদের পাপেই তোমাদের মৃত্যু হবে। আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা সেখানে আসতে পারো না?”
[22] এর ফলে ইহুদিরা বাধ্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও কি আত্মহত্যা করবে? সেই কারণেই ও কি বলছে, ‘আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখানে তোমরা আসতে পারো না’?”
[23] তিনি কিন্তু বলে চললেন, “তোমরা অধোলোকের, আমি ঊর্ধ্বলোকের। তোমরা এই জগতের, আমি এই জগতের নই।
[24] আমি তোমাদের বলেছি, তোমাদের পাপেই তোমাদের মৃত্যু হবে; আমি নিজের বিষয়ে যা দাবি করেছি, যে আমিই তিনি, তোমরা তা বিশ্বাস না করলে অবশ্যই তোমাদের পাপে তোমাদের মৃত্যু হবে।”
[25] তারা জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে?” যীশু উত্তর দিলেন, “সর্বক্ষণ যা দাবি করে আসছি, আমি সেই।
[26] তোমাদের বিষয়ে বিচার করে আমার অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনি সত্য। তাঁর কাছ থেকে আমি যা শুনেছি, জগৎকে সেকথাই বলি।”
[27] তারা বুঝতে পারল না যে, যীশু তাদের কাছে তাঁর পিতার বিষয়ে বলছেন।
[28] তাই যীশু বললেন, “যখন তোমরা মনুষ্যপুত্রকে ঊর্ধ্বে উত্তোলন করবে, তখন জানতে পারবে যে, আমি নিজেকে যা বলে দাবি করি, আমি সেই। আর আমি নিজে থেকে কিছুই করি না, কিন্তু পিতা আমাকে যা শিক্ষা দেন, আমি শুধু তাই বলি।
[29] যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনি আমার সঙ্গেই আছেন। তিনি আমাকে একা পরিত্যাগ করেননি, কারণ আমি সর্বদা তাঁর প্রীতিজনক কাজ করি।”
[30] তিনি এসব কথা বললে অনেকেই তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করল।
[31] যে ইহুদিরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল, যীশু তাদের বললেন, “যদি তোমরা আমার বাক্যে অবিচল থাকো, তাহলে তোমরা প্রকৃতই আমার শিষ্য।
[32] তখন তোমরা সত্যকে জানবে, আর সেই সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।”
[33] তারা তাঁকে বলল, “আমরা অব্রাহামের বংশধর, আমরা কখনও কারও দাসত্ব করিনি। তাহলে আপনি কী করে বলছেন, আমরা মুক্ত হব?”
[34] যীশু তাদের উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যে ব্যক্তি পাপ করে, সে পাপেরই দাসত্ব করে।
[35] কোনও দাস পরিবারে স্থায়ী জায়গা পায় না, কিন্তু পরিবারে পুত্রের স্থান চিরদিনের।
[36] তাই পুত্র যদি তোমাদের মুক্ত করেন, তাহলেই তোমরা প্রকৃত মুক্ত হবে।
[37] আমি জানি, তোমরা অব্রাহামের বংশধর, তবু আমার বাক্য তোমাদের অন্তরে স্থান পায় না বলে তোমরা আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছ।
[38] পিতার সান্নিধ্যে আমি যা দেখেছি, তোমাদের তাই বলছি। আর তোমাদের পিতার কাছে তোমরা যা শুনেছ, তোমরা তাই করে থাকো।”
[39] তারা উত্তর দিল, “অব্রাহাম আমাদের পিতা।” যীশু তাদের বললেন, “তোমরা যদি অব্রাহামের সন্তান হতে, তাহলে অব্রাহাম যা করেছিলেন, তোমরাও তাই করতে।
[40] অথচ, তোমরা আমাকে হত্যা করার জন্য কৃতসংকল্প হয়েছ। আমি সেই ব্যক্তি, যে ঈশ্বরের কাছ থেকে যে সত্য শুনেছি, তা তোমাদের কাছে প্রকাশ করেছি। অব্রাহাম এমন সব কাজ করেননি।
[41] তোমাদের নিজেদের পিতা যা করে, তোমরা সেইসব কাজই করছ।” তারা প্রতিবাদ করে বলল, “আমরা অবৈধ সন্তান নই। আমাদের একমাত্র পিতা স্বয়ং ঈশ্বর।”
[42] যীশু তাদের বললেন, “ঈশ্বর তোমাদের পিতা হলে তোমরা আমাকে ভালোবাসতে, কারণ আমি ঈশ্বরের কাছ থেকেই এসেছি। আর আমি এখন এখানে আছি। আমি নিজের ইচ্ছানুসারে আসিনি, কিন্তু তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।
[43] আমার ভাষা তোমাদের বোধগম্য হচ্ছে না কেন? কারণ তোমরা আমার কথা শুনতে অক্ষম।
[44] তোমরা তোমাদের পিতা দিয়াবলের, এবং তোমাদের পিতার অভিলাষ সকল পূর্ণ করাই তোমাদের ইচ্ছা। প্রথম থেকেই সে এক হত্যাকারী। তার মধ্যে সত্যের লেশমাত্র নেই, কারণ সে সত্যনিষ্ঠ নয়। সে তার নিজস্ব স্বভাববশেই মিথ্যা বলে, কারণ সে এক মিথ্যাবাদী এবং সব মিথ্যার জনক।
[45] কিন্তু আমি যদিও সত্যিকথা বলি, তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো না।
[46] তোমরা কি কেউ আমাকে পাপের দোষী বলে প্রমাণ করতে পারো? আমি যদি সত্যি বলি, তাহলে কেন তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো না?
[47] যে ঈশ্বরের আপনজন, সে ঈশ্বরের সব কথা শোনে। তোমরা যে শোনো না তার কারণ হল, তোমরা ঈশ্বরের আপনজন নও।”
[48] উত্তরে ইহুদিরা যীশুকে বলল, “আমরা যে বলি, আপনি শমরীয় এবং একজন ভূতগ্রস্ত, তা কি যথার্থ নয়?”
[49] যীশু বললেন, “আমি ভূতগ্রস্ত নই, কিন্তু আমি আমার পিতাকে সমাদর করি, আর তোমরা আমার অনাদর করো।
[50] আমি আপন গৌরবের অন্বেষণ করি না, কিন্তু একজন আছেন, যিনি তা অন্বেষণ করেন, তিনিই বিচার করবেন।
[51] আমি তোমাদের সত্যি বলছি, কেউ যদি আমার বাক্য পালন করে, সে কখনও মৃত্যু দর্শন করবে না।”
[52] কিন্তু একথা শুনে ইহুদিরা বলে উঠল, “এখন আমরা জানতে পারলাম যে, আপনি ভূতগ্রস্ত! অব্রাহাম এবং ভাববাদীদেরও মৃত্যু হয়েছে, তবু আপনি বলছেন যে আপনার বাক্য পালন করে সে কখনও মৃত্যুর আস্বাদ পাবে না।
[53] আপনি কি আমাদের পিতা অব্রাহামের চেয়েও মহান? তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, ভাববাদীরাও তাই। আপনি নিজের সম্পর্কে কী মনে করেন?”
[54] যীশু উত্তর দিলেন, “আমি যদি আত্মগৌরব করতাম, তবে আমার গৌরব মূল্যহীন। আমার পিতা, যাঁকে তোমরা নিজেদের ঈশ্বর বলে দাবি করছ, তিনিই আমাকে গৌরব দান করেন।
[55] তোমরা তাঁকে না জানলেও আমি তাঁকে জানি। আমি যদি বলতাম, আমি তাঁকে জানি না, তাহলে তোমাদেরই মতো আমি মিথ্যাবাদী হতাম। কিন্তু আমি তাঁকে জানি, আর তাঁর বাক্য পালন করি।
[56] আমার দিন দর্শনের প্রত্যাশায় তোমাদের পিতা অব্রাহাম উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন এবং তা দর্শন করে তিনি আনন্দিত হয়েছেন।”
[57] ইহুদিরা তাঁকে বলল, “আপনার বয়স পঞ্চাশ বছরও অতিক্রম করেনি, আর আপনি কি না অব্রাহামকে দর্শন করেছেন!”
[58] যীশু উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, অব্রাহামের জন্মের পূর্ব থেকেই আমি আছি।”
[59] একথা শুনে তারা তাঁকে আঘাত করার জন্য পাথর তুলে নিল। কিন্তু যীশু লুপ্ত হলেন এবং সবার অলক্ষ্যে মন্দির-প্রাঙ্গণ থেকে চলে গেলেন।