[1] এরপর যীশু গালীল হ্রদের অপর পারে গেলেন, এই হ্রদকে তিবিরিয়াও বলে৷
[2] বহু লোক তাঁর পেছনে পেছনে চলতে লাগল, কারণ রোগীদের সুস্থ করতে তিনি যে সব অলৌকিক চিহ্ন করতেন তা তারা দেখেছিল৷
[3] যীশু এবং তাঁর শিষ্যরা পাহাড়ের উপরে গিয়ে সেখানে বসলেন৷
[4] সেই সময় ইহুদীদের নিস্তারপর্ব এগিয়ে আসছিল৷
[5] যীশু যখন দেখলেন বহু লোক তাঁর কাছে আসছে তখন তিনি ফিলিপকে বললেন, “এই লোকদের খেতে দেবার জন্য আমরা কোথায় রুটি কিনতে পাব?”
[6] যীশু তাঁকে পরীক্ষা করবার জন্যই একথা বললেন, কারণ যীশু কি করবেন তা তিনি আগেই জানতেন৷
[7] ফিলিপ যীশুকে বললেন, “প্রত্যেকের হাতে এক টুকরো করে রুটি দিতে গেলে সারা মাসের রোজগারে রুটি কিনলেও তা যথেষ্ট হবে না৷”
[8] যীশুর শিষ্যদের মধ্যে আর একজন, যার নাম আন্দ্রিয়, ইনি শিমোন পিতরের ভাই, তিনি যীশুকে বললেন,
[9] “এখানে একটা ছোট ছেলে আছে, যার কাছে যবের পাঁচটা রুটি আর ছোট দুটো মাছ আছে, কিন্তু এত লোকের জন্য নিশ্চয়ই সেগুলি যথেষ্ট হবে না৷”
[10] যীশু বললেন, “লোকদের বসিয়ে দাও৷” সেই জায়গায় অনেক ঘাস ছিল৷ তখন সব লোকেরা বসে গেল৷ সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার পুরুষ ছিল৷
[11] এরপর যীশু সেই রুটি কখানা নিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন এবং যারা সেখানে বসেছিল তাদের সেগুলি ভাগ করে দিলেন৷ আর তিনি মাছও ভাগ করে দিলেন৷ যে যত চাইল তত পেল৷
[12] তারা পরিতৃপ্ত হলে, যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, “যে সব টুকরো টাকরা পড়ে আছে তা জড়ো কর, যেন কোন কিছু নষ্ট না হয়৷”
[13] তখন তাঁরা সে সব জড়ো করলেন৷ লোকেরা খাবার পরে যবের সেই পাঁচ খানা রুটির টুকরো-টাকরা যা পড়ে ছিল শিষ্যরা তা জড়ো করলে বারো টুকরী ভর্তি হয়ে গেল৷
[14] লোকেরা যীশুকে এই অলৌকিক চিহ্ন করতে দেখে বলতে লাগল, “জগতে যাঁর আগমনের কথা আছে ইনি নিশ্চয়ই সেই ভাববাদী৷”
[15] এতে যীশু বুঝলেন লোকেরা তাঁকে রাজা করবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ তাই তিনি তাদের ছেড়ে একাই সেই পাহাড়ে উঠে গেলেন৷
[16] সন্ধ্যা হলে যীশুর শিষ্যরা হ্রদের ধারে নেমে গেলেন৷
[17] তাঁরা একটা নৌকায় উঠে হ্রদের অপর পারে কফরনাহূমের দিকে যেতে থাকলেন৷ তখন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, আর যীশু তখনও তাদের কাছে আসেন নি৷
[18] আর খুব জোরে ঝোড়ো বাতাস বইছিল, ফলে হ্রদে বড় বড় ঢেউ উঠছিল৷
[19] এরই মধ্যে তিন চার মাইল নৌকা বেয়ে যাবার পর যীশুর শিষ্যরা দেখলেন, যীশু জলের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছেন৷ তিনি যখন নৌকার কাছাকাছি এলেন, তখন শিষ্যরা খুব ভয় পেয়ে গেলেন৷
[20] কিন্তু তিনি তাঁদের বললেন, “এই যে আমি; ভয় পেও না৷”
[21] তখন তাঁরা খুশী হয়ে যীশুকে নৌকাতে তুলে নিলেন৷ আর তাঁরা যেখানে যাচ্ছিলেন নৌকা তখনই সেখানে পৌঁছে গেল৷
[22] হ্রদের অপর পারে যে জনতা ছিল, পরের দিন তারা বুঝতে পারল যে কেবলমাত্র একটা নৌকাই সেখানে ছিল আর যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তাতে ওঠেন নি৷ তাঁর শিষ্যরা নিজেরাই চলে গিয়েছিলেন৷
[23] কিন্তু যেখানে প্রভুকে ধন্যবাদ দেওয়ার পর লোকেরা রুটি খেয়েছিল, সেইখানে তখন তিবিরিয়া থেকে কয়েকটা নৌকা এল৷
[24] কিন্তু যখন লোকেরা দেখল যে যীশু বা তাঁর শিষ্যরা কেউই সেখানে নেই, তখন তারা নৌকায় চড়ে যীশুর খোঁজে কফরনাহূমে চলে গেল৷
[25] তারা হ্রদের অপর পারে যীশুকে দেখতে পেয়ে বলল, “গুরু, আপনি এখানে কখন এসেছেন?”
[26] এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমরা অলৌকিক চিহ্ন দেখেছ বলে যে আমার খোঁজ করছ তা নয়, কিন্তু তোমরা রুটি খেয়ে তৃপ্ত হয়েছিলে বলেই আমার খোঁজ করছ৷
[27] খাদ্যের মতো নশ্বর বস্তুর জন্য কাজ করো না৷ কিন্তু যে খাদ্য প্রকৃতই স্থায়ী ও যা অনন্ত জীবন দান করে, তার জন্য কাজ কর যা মানবপুত্র তোমাদের দেবেন৷ কারণ পিতা ঈশ্বর তোমাদের দেখিয়েছেন যে তিনি মানবপুত্রের সঙ্গেই আছেন৷”
[28] তারা তাঁকে বলল, “ঈশ্বরের কাজ করার জন্য আমাদের কি করতে হবে?”
[29] এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, “ঈশ্বর যাঁকে পাঠিয়েছেন তোমরা যেন তাঁকে বিশ্বাস কর৷ এই হল ঈশ্বরের কাজ৷”
[30] তারা তাঁকে বলল, “আপনি কি এমন অলৌকিক কাজ করছেন, যা দেখে আমরা জানতে পারব যে আপনিই সেই ব্যক্তি যাঁকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন ও আপনার ওপর বিশ্বাস করব?
[31] আমাদের পিতৃপুরুষরা মরুপ্রান্তরে মান্না খেয়েছিল৷ যেমন শাস্ত্রে লেখা আছে: ‘তিনি তাদের খাবার জন্য স্বর্গ থেকে রুটি দিলেন৷’”
[32] তখন যীশু তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, মোশি স্বর্গ থেকে সেই রুটি তোমাদের দেন নি, কিন্তু আমার পিতাই স্বর্গ থেকে সত্যিকারের রুটি তোমাদের দেন৷
[33] স্বর্গ থেকে নেমে এসে যিনি জগত সংসার জীবন দান করেন তিনিই ঈশ্বরের দেওয়া রুটি৷”
[34] তারা তাঁকে বলল, “মহাশয়, সেই রুটি সব সময় আমাদের দিন৷”
[35] যীশু তাদের বললেন, “আমিই সেই রুটি যা জীবন দান করে৷ যে কেউ আমার কাছে আসে সে কখনও ক্ষুধার্ত হবে না, আর যে কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রাখে কখনও তার পিপাসা পাবে না৷
[36] কিন্তু আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমরা আমায় দেখেছ অথচ আমায় বিশ্বাস কর না৷
[37] পিতা আমাকে যাদের দেন, তারা প্রত্যেকেই আমার কাছে আসবে৷ আর যাঁরা আমার কাছে আসে, আমি তাদের কখনই ফিরিয়ে দেব না৷
[38] কারণ আমি আমার খুশী মত কাজ করতে স্বর্গ থেকে নেমে আসি নি, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করতে এসেছি৷
[39] যিনি আমায় পাঠিয়েছেন তাঁর ইচ্ছা এই যে যাদের তিনি আমায় দিয়েছেন তাদের একজনকেও যেন আমি না হারাই; বরং শেষ দিনে যেন তাদের সকলকে আমি উত্থিত করি৷
[40] আমার পিতা এই চান, যে কেউ তাঁর পুত্রকে দেখে ও তাঁকে বিশ্বাস করে, সে যেন অনন্ত জীবন লাভ করে; আর আমিই তাকে শেষ দিনে ওঠাব৷”
[41] তখন ইহুদীরা যীশুর সম্পর্কে গুঞ্জন শুরু করল, কারণ তিনি বলেছিলেন, “আমিই সেই রুটি যা স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে৷”
[42] তারা বলল, “তিনি কি যোষেফের ছেলে নন? আমরা কি এর বাবা মাকে চিনি না? তাহলে এখন কেমন করে তিনি বলছেন, ‘আমি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি?’”
[43] এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, “নিজেদের মধ্যে ওসব বচসা বন্ধ কর৷
[44] যিনি আমায় পাঠিয়েছেন সেই পিতা না আনলে কেউই আমার কাছে আসতে পারে না; আর আমিই তাকে শেষ দিনে জীবিত করে তুলব৷
[45] ভাববাদীদের পুস্তকে লেখা আছে: ‘তারা সকলেই ঈশ্বরের কাছে শিক্ষা লাভ করবে৷’ যে কেউ পিতার কাছে শুনে শিক্ষা পেয়েছে সেই আমার কাছে আসে৷
[46] আমি বলছি না যে, কেউ পিতাকে দেখেছেন৷ কেবলমাত্র যিনি পিতার কাছ থেকে এসেছেন তিনিই পিতাকে দেখেছেন৷
[47] “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যে কেউ বিশ্বাস করেছে সেই অনন্ত জীবন পেয়েছে৷
[48] আমিই সেই রুটি যা জীবন দেয়৷
[49] তোমাদের পিতৃপুরুষরা মরুপ্রান্তরে মান্না খেয়েছিল, কিন্তু তবু তারা মারা গিয়েছিল৷
[50] এ সেই রুটি যা স্বর্গ থেকে নেমে আসে, আর কেউ যদি তা খায়, তবে সে মরবে না৷
[51] আমিই সেই জীবন্ত রুটি যা স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে৷ কেউ যদি এই রুটি খায় তবে সে চিরজীবি হবে৷ যে রুটি আমি দেব তা হল আমার দেহের মাংস৷ তা আমি দিই যাতে জগত জীবন পায়৷”
[52] এই কথা শুনে ইহুদীদের মধ্যে তর্ক বেধে গেল৷ তারা বলতে লাগল, “এই লোকটা কেমন করে তার দেহের মাংস আমাদের খেতে দিতে পারে?”
[53] যীশু তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি; তোমরা যদি মানবপুত্রের মাংস না খাও ও তাঁর রক্ত পান না কর, তাহলে তোমাদের মধ্যে জীবন নেই৷
[54] যে কেউ আমার মাংস খায় ও আমার রক্ত পান করে সে অনন্ত জীবন পায়, আর শেষ দিনে আমি তাকে ওঠাবো৷
[55] আমার মাংসই প্রকৃত খাদ্য ও আমার রক্তই প্রকৃত পানীয়৷
[56] যে আমার মাংস খায় ও আমার রক্ত পান করে সে আমার মধ্যে থাকে, আর আমিও তার মধ্যে থাকি৷
[57] “যেমন জীবন্ত পিতা আমাকে পাঠিয়েছেন, আর পিতার জন্য আমি জীবিত আছি, ঠিক সেরকম যে আমাকে খায় সে আমার দরুন জীবিত থাকবে৷
[58] এ সেই রুটি যা স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিল৷ এটা তেমন রুটি নয় যা তোমাদের পিতৃপুরুষরা খেয়েছিল এবং তা সত্ত্বেও পরে তারা সকলে মারা গিয়েছিল৷ এই রুটি যে খায় সে চিরজীবি হবে৷”
[59] কফরনাহূমের সমাজ-গৃহে শিক্ষা দেবার সময় যীশু এই সব কথা বললেন৷
[60] যীশুর শিষ্যদের মধ্যে অনেকে তাঁর এই কথা শুনে বলল, “এ বড়ই কঠিন কথা; কে এ গ্রহণ করতে পারে?”
[61] যীশু অন্তরে টের পেলেন যে তাঁর শিষ্যরা এই বিষয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছে৷ তাই তিনি তাদের বললেন, “এই শিক্ষায় কি তোমরা ধাক্কা পেয়েছ?
[62] তবে মানবপুত্র আগে যেখানে ছিলেন উর্দ্ধে সেখানে তাঁকে ফিরে যেতে দেখলে তোমরা কি বলবে?
[63] আত্মাই জীবন দান করে, রক্ত মাংসের শরীর কোন উপকারে আসে না৷ আমি তোমাদের সকলকে যে সব কথা বলেছি তা হল আধ্যাত্মিক আর তাই জীবন দান করে৷
[64] কিন্তু তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা বিশ্বাস করে না৷” কারণ যীশু শুরু থেকেই জানতেন কে কে তাঁকে বিশ্বাস করে না, আর কেই বা তাঁকে শত্রুর হাতে ধরিয়ে দেবে৷
[65] তাই তিনি বললেন, “এজন্য আমি তোমাদের বলেছি, ‘পিতা ইচ্ছা না করলে কেউই আমার কাছে আসতে পারে না৷’”
[66] এই কারণেই তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অনেকে পিছিয়ে গেল, তাঁর সঙ্গে চলাফেরা বন্ধ করে দিল৷
[67] তখন যীশু সেই বারোজন প্রেরিতকে বললেন, “তোমরাও কি চলে যেতে চাইছ?”
[68] শিমোন পিতর বললেন, “প্রভু, আমরা কার কাছে যাব? আপনার কাছে সেই বাণী আছে যা অনন্ত জীবন দান করে৷
[69] আমরা বিশ্বাস করি ও জানি যে আপনিই সেই পবিত্র একজন, যিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছেন৷”
[70] এর উত্তরে যীশু তাঁদের বললেন, “আমি কি তোমাদের বারোজনকে মনোনীত করি নি? তবু তোমাদের মধ্যে একজন দিয়াবল আছে৷”
[71] তিনি শিমোন ঈষ্করিয়োতের ছেলে যিহূদার বিষয়ে বলছিলেন, কারণ যিহূদা সেই বারো জনের মধ্যে একজন হলেও পরে যীশুকে শত্রুর হাতে তুলে দেবে৷